গাড়ি ভাতার সিদ্ধান্তে সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলল টিআইবি

সুদমুক্ত ঋণে কেনা সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মাসিক ৫০ হাজার টাকা বহাল রাখার সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির দাবি, প্রধানমন্ত্রীর ব্যয়-সাশ্রয়ী নীতিগত অবস্থান থাকা সত্ত্বেও এ সিদ্ধান্ত বহাল রাখা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত একশ্রেণির আমলার প্রভাবের কাছে সরকারের নতি স্বীকারের ইঙ্গিত বহন করে।

রোববার (১৯ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন এবং এর পেছনে কার প্রভাব কাজ করেছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, সরকারি সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং জনগণের অর্থের অপচয় কমানোর লক্ষ্যে সুদমুক্ত ঋণে কেনা গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৫০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার টাকায় নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে এ ধরনের সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা বাতিলের নীতিগত অবস্থানও ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা রাষ্ট্রের ব্যয়-কৃচ্ছতা নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছে টিআইবি।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “সর্বোচ্চ পর্যায়ের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কোন শক্তির প্রভাবে সরকার এ ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।” তিনি মনে করেন, সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের প্রভাব ও মানসিকতা বিশ্লেষণ করাও সরকারের জন্য জরুরি।

টিআইবির মতে, এ সুবিধা শুধু প্রশাসনের নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনীর কিছু কর্মকর্তাও এ সুবিধার আওতায় রয়েছেন। তবে শুরু থেকেই সুবিধাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের যে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে, তা বৈষম্যমূলক এবং সরকারি চাকরিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে।

সংস্থাটি দাবি করে, মাত্র প্রায় ২ হাজার ৪০০ কর্মকর্তার জন্য বিশেষ এ সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে, যা একই ক্যাডার বা সমমর্যাদার অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে। এর ফলে সরকারি চাকরিতে আন্তঃক্যাডার সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট পদে পৌঁছাতে অসুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার ও নিজস্ব অর্থে জ্বালানি ব্যয় বহনের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা অনুসরণ করার পরিবর্তে একশ্রেণির সুবিধাভোগী কর্মকর্তা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় হয়েছেন। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এ ধরনের বিশেষ সুবিধা বহাল রাখা রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে না বলেও মন্তব্য করে টিআইবি।

সংস্থাটি আরও উল্লেখ করে, জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় সরকার ইতোমধ্যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের যে দাবি জানানো হচ্ছে, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দুর্নীতি হ্রাসের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

বিবৃতির শেষাংশে টিআইবি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলে, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে জনগণের অর্থের অপচয় রোধ এবং সরকারি চাকরিতে বৈষম্য কমাতে ব্যয়-সাশ্রয়ী নীতিতে অটল থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো ধরনের অন্যায্য প্রভাবমুক্ত থেকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত বলে মনে করে সংস্থাটি।