দেশে বছরে ৩০ লাখ টন ই-বর্জ্য, পুনঃপ্রক্রিয়াজাত হয় ১০ শতাংশেরও কম

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন ইলেকট্রনিক বর্জ্য (ই-বর্জ্য) উৎপন্ন হলেও এর ১০ শতাংশেরও কম আনুষ্ঠানিকভাবে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান থাকলেও গত অর্থবছরে কোনো প্রতিষ্ঠানই ব্যবহার অযোগ্য ইলেকট্রনিক পণ্য সংগ্রহ করেনি। অধিকারভিত্তিক সংগঠন ভয়েস (VoICE)-এর এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

সোমবার (২৭ জুলাই) রাজধানীর ওয়াইডব্লিউসিএ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: বাস্তবতা ও করণীয়’ শীর্ষক নীতি-পরামর্শ সংলাপে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। ভয়েসের উদ্যোগে এবং অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রগ্রেসিভ কমিউনিকেশনস (এপিসি)-এর সহযোগিতায় এ সংলাপের আয়োজন করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১ কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। জরিপে অন্তর্ভুক্ত সব প্রতিষ্ঠান পরিবেশ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত হলেও ব্যবহার অযোগ্য ইলেকট্রনিক পণ্য সংগ্রহ ও পুনঃব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগের অভাব লক্ষ্য করা গেছে।

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ভয়েসের উপ-পরিচালক মুশাররাত মাহেরা। তিনি জানান, ২০২২ সালে বিশ্বে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মেট্রিক টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে উৎপন্ন ই-বর্জ্যের পরিমাণ প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন। তিনি বলেন, যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশে ই-বর্জ্য থেকে প্রতিবছর প্রায় ২০০ থেকে ২২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সম্পদ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. রওশন মমতাজ বলেন, সিটি করপোরেশনগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও কৌশলগত, আধুনিক ও দক্ষ করতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর দায়িত্ব বণ্টন ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন খান বলেন, ইলেকট্রনিক পণ্যের কার্যকর মনিটরিং ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করে ই-বর্জ্যের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে সার্কুলার ইকোনমিভিত্তিক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক পরামর্শক তড়িৎ কান্তি বিশ্বাস বলেন, গবেষণায় শুধু সেকেন্ডারি তথ্যের ওপর নির্ভর না করে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহেও গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সব অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত কৌশল প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যাতে ই-বর্জ্যকে মূল্যবান সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হয়।

সমাপনী বক্তব্যে ভয়েসের নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদ বলেন, সরকারি পরিপত্রের মাধ্যমে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সুস্পষ্ট কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ই-বর্জ্যকে মূল্যবান সম্পদে রূপান্তরের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।

সংলাপে নাগরিক উদ্যোগ, আরণ্যক ফাউন্ডেশন, ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ, বিভিন্ন রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। বক্তারা ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১-এর কার্যকর বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং সরকার, শিল্পখাত, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাদের মতে, সঠিক নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ই-বর্জ্যকে পরিবেশের জন্য হুমকি নয়, বরং অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করা সম্ভব।