বগুড়ায় পাইলট ট্রেনিং একাডেমি গড়ছে সরকার, এভিয়েশন হাবের লক্ষ্যে এগোচ্ছে বাংলাদেশ

দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বগুড়ায় একটি পাইলট ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সমন্বিত এভিয়েশন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন ও বিমান পরিবহন খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও চলমান রয়েছে।

বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর বনানীর হোটেল সেরাটনে আয়োজিত ‘বিয়োন্ড উইথ বোয়িং’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এসব তথ্য জানান।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশকে একটি রিজিয়নাল এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে এভিয়েশন খাতের জন্য একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বগুড়ায় একটি আধুনিক পাইলট ট্রেনিং একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে দেশের বিমান চলাচল খাতের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, দেশের বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ২১টি উড়োজাহাজ ভাড়ার চুক্তি করেছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার ফলে দেশের ক্রমবর্ধমান বিমানযাত্রীদের চাহিদা পূরণে উল্লেখযোগ্য সহায়তা মিলবে।

তিনি আরও বলেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বছরে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ যাত্রীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। এ ছাড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসও বহরে ১৪টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর বহর সম্প্রসারণ দেশের এভিয়েশন খাতকে আরও শক্তিশালী করবে এবং আন্তর্জাতিক সংযোগ বৃদ্ধি করবে।

প্রধানমন্ত্রীর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে যাত্রীসেবা প্রদানের সক্ষমতা আরও বাড়বে। বাংলাদেশের লক্ষ্য এশীয় এভিয়েশন খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক প্রবেশদ্বার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা।

তবে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর জন্য কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জেট ফুয়েলের উচ্চমূল্যের কারণে পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি শিল্পের বিকাশে সহায়ক একটি অনুকূল নীতিগত ও প্রশাসনিক কাঠামোর প্রয়োজন রয়েছে। এ খাতে কর-সুবিধা ও আর্থিক সহায়তার বিষয়েও সরকার ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে বলে জানান তিনি।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার ঘোষণা শুধু ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের জন্য নয়, বরং দেশের পুরো এভিয়েশন শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

অনুষ্ঠানে ইউএস-বাংলা গ্রুপ ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, দেশের আন্তর্জাতিক আকাশপথে এখনও প্রায় ৭০ শতাংশ যাত্রী বিদেশি এয়ারলাইনস পরিবহন করে। নতুন উড়োজাহাজ সংযোজনের ফলে আন্তর্জাতিক রুটে দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশ দেশে ধরে রাখা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, ইউএস-বাংলার লক্ষ্য শুধু একটি সফল এয়ারলাইনস পরিচালনা করা নয়, বরং এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক এভিয়েশন গ্রুপে পরিণত করা। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণের পাশাপাশি কার্গো, এমআরও (মেইনটেন্যান্স, রিপেয়ার অ্যান্ড ওভারহল), ফ্লাইট ক্যাটারিং, এভিয়েশন প্রশিক্ষণ এবং দক্ষ জনবল উন্নয়নের সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

নতুন উড়োজাহাজ সংযোজনের পর দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বিদ্যমান রুটে ফ্লাইট সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। পাশাপাশি ব্যাঙ্গালুরু, হায়দ্রাবাদ, কলম্বো, কাঠমান্ডু, জহুর বাহরু, পেনাং, কুনমিং, শেনজেন, বেইজিং, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, কুয়েত, বাহরাইন, মদিনা, দাম্মাম ও সালালাসহ একাধিক নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন, বোয়িংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট (বিক্রয়) পল রিগিহ, জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া মো. নুরদ্দিন অপুসহ বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনীতিক, ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।