স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল তালিকা রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রণয়ন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দাবি করে বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় এলেও শহীদদের নাম-পরিচয় সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এখনো সম্পন্ন হয়নি।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাজধানীর সিরডাপ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘আজাদী সংগ্রামের পটভূমিতে জুলাই বিপ্লব ২০২৪’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ওয়ান ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওআইআরডি) অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমানে জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি তালিকা থাকলেও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত হয়নি। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট সংখ্যক শহীদের কথা বলা হলেও তাদের নাম-পরিচয় এখনো কেন রাষ্ট্রীয় নথিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তার ভাষায়, ইতিহাস সংরক্ষণ এবং শহীদ পরিবারের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসকে বিকৃতির ঊর্ধ্বে রেখে তথ্যভিত্তিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়নের জন্য শহীদদের পরিচয় রাষ্ট্রীয়ভাবে লিপিবদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, ২০২৪ সালের সেই আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস রচনার এখনই উপযুক্ত সময়। তবে তিনি অভিযোগ করেন, ৫ আগস্টের পর এবং বিশেষ করে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর অনেক রাজনৈতিক দলের অবস্থান ও বক্তব্যে পরিবর্তন এসেছে। আন্দোলনের সময় দেওয়া নানা প্রতিশ্রুতি থেকে তারা সরে গিয়ে নতুন বয়ান তৈরির চেষ্টা করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, জনগণের প্রত্যাশা ও আন্দোলনের চেতনার প্রতিফলন ঘটিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা উচিত। অন্যথায় গণ-আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে না।
ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যক্রম যে গতিতে এগোচ্ছিল, বর্তমান সরকারের সময় তা ধীর হয়ে গেছে। একই সঙ্গে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার কাজেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার দাবি, জুলাইয়ের স্মৃতি ও ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা হলে জনগণ তা প্রতিহত করবে।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের প্রতি কোনো ধরনের হয়রানি বা দমন-পীড়ন গ্রহণযোগ্য হবে না। যারা আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছেন, তাদের অবদান অস্বীকার করা উচিত নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দেশের স্বার্থে জাতীয় ঐক্যের পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে জামায়াত আমির বলেন, জনগণের অধিকার ও জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে যেকোনো ইতিবাচক উদ্যোগে তার দল সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে কোনো ধরনের আধিপত্যবাদ বা আপসের রাজনীতিকে তারা সমর্থন করবে না।
অনুষ্ঠানে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান বলেন, বর্তমান সরকার যদি অতীতের ফ্যাসিবাদী শাসনের ধারা অনুসরণ করে, তাহলে তাদেরও একই ধরনের পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। তিনি অতীতের ফ্যাসিবাদের সহযোগীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার সম্পন্ন করার দাবি জানান।
জুলাই আন্দোলনের শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহীদুল ইসলাম আবেগঘন বক্তব্যে বলেন, জুলাই বিপ্লবের চেতনা নস্যাৎ করার নানা চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বইটির লেখক মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন বলেন, জুলাই বিপ্লবের আদর্শ ও শিক্ষা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে হলে শিক্ষা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে এ আন্দোলনের ইতিহাসকে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ওআইআরডির উপদেষ্টা ও বুয়েটের শিক্ষক মো. ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য আখতারুজ্জামান, জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, ডাকসুর সাবেক ভিপি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম), শিবিরের সাবেক সভাপতি মনজুরুল ইসলাম এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলামসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা।
