আমদানি কমিয়ে কৃষিতে স্বনির্ভরতার পথে এগোচ্ছে সরকার

দেশের কৃষিকে আরও উৎপাদনমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করে কৃষিপণ্যের আমদানি কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।

মঙ্গলবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কৃষি খাতের বিভিন্ন কার্যক্রম ও অগ্রগতি তুলে ধরেন। এ সময় কৃষি সচিব মো. সেলিম খান উপস্থিত ছিলেন। কৃষিমন্ত্রী একই সঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করছেন।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সংরক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশের চাহিদা পূরণে ভবিষ্যতে যাতে কোনো কৃষিপণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে না হয়, সেই লক্ষ্যেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

সারের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে সারের কোনো ঘাটতি নেই। চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে এবং গত বছরের তুলনায় এবার মজুতের পরিমাণও বেশি। সারের কৃত্রিম সংকটের বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ তুলে তিনি এটিকে পরিকল্পিত অপপ্রচার বলে মন্তব্য করেন।

কৃষকদের সরকারি সহায়তা আরও সহজ করতে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রমের অগ্রগতির কথাও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতি মাসে পর্যায়ক্রমে সাড়ে ৩ লাখ থেকে ৪ লাখ কৃষকের মধ্যে কৃষক কার্ড বিতরণ করা হবে। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ১৪ লাখ কৃষকের তথ্য নিয়ে ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে।

কৃষি ও পরিবেশ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি তুলে ধরে আমিন উর রশিদ বলেন, ছয় মাসে ২৫ লাখ গাছের চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এরই মধ্যে ২৪ লাখ ১৮ হাজারের বেশি চারা রোপণ করা হয়েছে। একই সময়ে ৪৭৮ দশমিক ৯ কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্যের বিপরীতে ৪৭৫ দশমিক ৬১ কিলোমিটার খনন শেষ হয়েছে।

পেঁয়াজের উৎপাদন ও সংরক্ষণ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী বলেন, চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশে পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজন হয়নি। সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে অতীতে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ নষ্ট হলেও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে এখন প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যাচ্ছে। আগামীতে তিন লাখ টন পেঁয়াজ সংরক্ষণের মতো অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

পাটবীজ, পেঁয়াজবীজ ও আদার ক্ষেত্রেও আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

খাদ্য উৎপাদনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি জানান, আগামী বছর থেকে ‘ব্রি ১১৮’ নামে নতুন একটি ধানের জাতের চাষ শুরু হবে। হাওর অঞ্চলে প্রচলিত সময়ের ১০ থেকে ১৫ দিন আগে এ জাতের ধান রোপণ করা সম্ভব হবে। ফলে আগাম বন্যার ঝুঁকিতে থাকা হাওরের ফসল রক্ষায় এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে সেচ ব্যবস্থায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, সেচের ব্যয় কৃষকদের জন্য বড় একটি চাপ। তাই দেশে সেচে ব্যবহৃত সব পাম্পকে পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে ৬০ থেকে ৬২ হাজার পাম্প সৌরবিদ্যুতে পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, উৎপাদন, সংরক্ষণ, সেচ ও প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষিকে আরও টেকসই করা হবে। এর ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হবে এবং বিদেশি কৃষিপণ্যের ওপর নির্ভরতাও ধীরে ধীরে কমে আসবে।