কৃষি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে নতুন নীতিমালা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থবছরে কৃষি ও পল্লি খাতে ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৫৪ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের অন্তত ৪ শতাংশ কৃষি খাতে বিতরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান নতুন কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালা ঘোষণা করেন।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোকে মোট ২০ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা কৃষি ঋণ বিতরণ করতে হবে। বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা।
এর আগে একটি ব্যাংকের মোট ঋণের অন্তত আড়াই শতাংশ কৃষি খাতে বিতরণের বাধ্যবাধকতা ছিল। সেই হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৯ হাজার কোটি টাকা। এবার ঋণ বিতরণের পরিমাণের পাশাপাশি ব্যাংকের মোট ঋণের কৃষি খাতে বরাদ্দের হারও বাড়ানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, কৃষি খাতে পর্যাপ্ত অর্থের প্রবাহ নিশ্চিত করে উৎপাদন বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণ করাই নতুন নীতিমালার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কৃষি ঋণ কার্যক্রমের তদারকি আরও কার্যকর করতে ‘ওয়েব বেসড এগ্রি-ক্রেডিট এমআইএস সফটওয়্যার’ চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
জামানত ছাড়াই মিলবে নির্দিষ্ট পরিমাণ ঋণ
নতুন নীতিমালায় কৃষি খাতে ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে প্রচলিত স্থাবর সম্পত্তির জামানতের পরিবর্তে ব্যক্তিগত, সামাজিক বা দলগত জামানত গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এর ফলে বিশেষ করে নারী, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ঋণ পাওয়ার সুযোগ বাড়বে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
শস্য, ফসল ও মৎস্য খাতের পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকার বিভিন্ন আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডেও দলগতভাবে ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি দলে কতজন সদস্য থাকতে পারবেন, সেই সীমাও আগের তুলনায় শিথিল করা হয়েছে।
যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন খাত
কৃষি ঋণের আওতা আরও বিস্তৃত করতে এবার বেশ কিছু নতুন খাত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে হ্যাচারিতে মাছ ও হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদন এবং উট পালনের মতো কার্যক্রম রয়েছে।
এ ছাড়া ব্লুবেরি চাষ, শিমুল মূল, অশ্বগন্ধা এবং ডিমের খোসা ব্যবহার করে জৈব সার উৎপাদনের মতো নতুন ও বিকল্প কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ডও ঋণ সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে।
কৃষক যাচাইয়ে কৃষক কার্ড
ঋণ বিতরণে প্রকৃত কৃষক শনাক্ত করতে স্থানীয় কৃষি, মৎস্য বা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার প্রত্যয়ন গ্রহণ করা যাবে। পাশাপাশি সরকারি ‘কৃষক কার্ড’ও কৃষক হিসেবে পরিচয় যাচাইয়ের দলিল হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
নতুন নীতিমালায় কৃষি ঋণের জন্য পাসবই থাকার বাধ্যবাধকতাও তুলে দেওয়া হয়েছে। এতে প্রান্তিক কৃষকদের ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বীমা
কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নতুন একটি ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ব্যাংক ও গ্রাহকের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে কৃষকদের বীমা সুবিধার আওতায় আনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জলবায়ুজনিত ক্ষতির ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, নতুন এই কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালার ফলে কৃষকদের কাছে অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও এটি ভূমিকা রাখবে।
