ঢামেকে চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির অভিযোগ

দেশের অন্যতম বৃহৎ সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক)। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন এই হাসপাতালে। রোগীর চাপ, হাসপাতালের বড় বাজেট এবং বিভিন্ন কেনাকাটা ও সেবা কার্যক্রমকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি, দালালচক্র, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং রোগীদের নির্দিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানমুখী করার অভিযোগ।
সাম্প্রতিক সময়ে হাসপাতালকেন্দ্রিক একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকারি দুটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে কয়েকজন চিকিৎসক, সাবেক ছাত্রনেতা ও ঠিকাদারের নাম উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। প্রতিবেদনে টেন্ডারে প্রভাব বিস্তার, হাসপাতাল প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ এবং রোগীদের নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। তবে অভিযুক্তদের কয়েকজন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক কয়েকজন শিক্ষার্থী এমবিবিএস শেষ করার পর ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তাদের সঙ্গে ছাত্রদলের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন নেতার যোগাযোগ রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হাসপাতালের বিভিন্ন কাজের টেন্ডার নিজেদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে নেওয়ার জন্য প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৫ মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের কক্ষে যান ডা. জাবেদ ও ডা. সুমন। তারা নিজেদের পছন্দের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে টেন্ডারের জন্য তদবির করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিচালক এতে সম্মতি না দেওয়ায় তারা চলে যান।
এরপর ২৬ মার্চ হাসপাতালের উপপরিচালক মো. আশরাফুল ইসলামকে হোয়াটসঅ্যাপে নিজেদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডার দেওয়ার বিষয়ে তদবির করেন ডা. জাবেদ। অভিযোগ অনুযায়ী, উপপরিচালক রাজি না হওয়ায় তাকে হুমকি দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে জোয়ারিয়া ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি টেন্ডারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব টেন্ডারে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান তুলনামূলক পিছিয়ে থাকলেও তাদের কাজ পাইয়ে দিতে প্রশাসনের ওপর চাপ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
বর্তমানে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার অধিকাংশ কাজ ই-জিপির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। নিয়ম অনুযায়ী, দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর দেওয়া দর ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই কাজ পাওয়ার কথা। ফলে বাইরে থেকে চাপ প্রয়োগ করে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
রোগীদের নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানোর অভিযোগ
ঢামেক হাসপাতালকে ঘিরে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো, কিছু রোগীকে হাসপাতালের বাইরে নির্দিষ্ট বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করাতে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে প্রাইম টিজি, রিভাইভ, ঢাকা ডায়াগনস্টিক ও হেলথ এইডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে বলে জানা গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের এজেন্টরা হাসপাতালের ভেতরে রোগী সংগ্রহে সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অভিযুক্তদের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, রোগীদের ভুল বুঝিয়ে বাড়তি অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন পরীক্ষা করানো, অন্য প্রতিষ্ঠানের এজেন্টদের সঙ্গে বিরোধে জড়ানো এবং হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্সদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়।
দালালচক্রের দৌরাত্ম্য
টেন্ডারের পাশাপাশি রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড, জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগের আশপাশে দালালদের সক্রিয়তার কথা জানিয়েছেন রোগী ও স্বজনরা।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে অন্তত ১৯ জন সক্রিয় দালালের নাম রয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের বিরুদ্ধে রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং হাসপাতাল এলাকায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবকটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদনে হাসপাতালের গাইনি বিভাগ, জরুরি বিভাগের নিউরোসার্জারি এবং সার্জারি আউটডোরের আশপাশকে দালালদের তৎপরতার গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অ্যাম্বুলেন্স থেকে মর্গ, নানা অভিযোগ
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়। কাছাকাছি দূরত্বে যাতায়াতের জন্য কয়েকশ টাকা ভাড়ার পরিবর্তে অনেক সময় কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
মর্গে লাশ হস্তান্তর, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দ্রুত দেওয়ার আশ্বাস এবং মৃতদেহ পরিবহন নিয়েও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালের সরকারি ওষুধ ও খাবার সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে।
রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে ওষুধ মজুত থাকার পরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে বলা হয়। ক্যান্টিন ও খাবার সরবরাহের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
চিকিৎসকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ
ঢামেকের কয়েকজন চিকিৎসকের অভিযোগ, ডা. জাভেদের বিরুদ্ধে দলীয় তহবিলের নামে চিকিৎসকদের কাছ থেকে মাসিক চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মেডিকেল অফিসারদের কাছ থেকে মাসে এক হাজার টাকা এবং আবাসিক চিকিৎসক ও আবাসিক সার্জনদের কাছ থেকে দেড় হাজার টাকা করে নেওয়া হতো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই চিকিৎসক দাবি করেন, নির্ধারিত সময়ে টাকা না দিলে তাদের ওপর চাপ ও হুমকি দেওয়া হতো। পরে এ ধরনের চাঁদা দেওয়া থেকে বিরত থাকার বিষয়ে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) ঢাকা মেডিকেল শাখা থেকে নির্দেশনাও দেওয়া হয় বলে তারা জানান।
ডা. মাহমুদুল হাসান খান সুমন নিজের ঠিকাদারি ব্যবসার কথা স্বীকার করলেও হাসপাতালের কোনো সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়ে তিনি জানতে পেরেছেন, তবে ঢামেকের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে তার কোনো ভূমিকা নেই।
ডা. জাবেদও চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি কিংবা কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকানার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক বিরোধের কারণে করা হচ্ছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, কয়েকজন ব্যক্তি তার কাছে এসে অতীতে বঞ্চিত থাকার কথা বলে টেন্ডারের বিষয়ে তদবির করেছেন।তিনি বলেন, হাসপাতালের টেন্ডার ই-জিপির মাধ্যমে হয়। নিয়ম অনুযায়ী যে প্রতিষ্ঠান কাজ পাওয়ার যোগ্য হবে, তারাই কাজ পাবে। সরাসরি কাউকে টেন্ডার দেওয়ার সুযোগ নেই বলে সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।হাসপাতাল প্রশাসনের কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কেও তিনি অবগত বলে জানান। বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী পাঠাতে চিকিৎসকদের বাধ্য করার অভিযোগের কথাও তিনি শুনেছেন বলে জানান।