অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার আভাস, তবে বিনিয়োগ-চাহিদায় গতি ফেরেনি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার আভাস মিললেও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনো মন্থর বলে মনে করছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)। সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি ফিরলেও মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, ধীর ঋণপ্রবাহ, ব্যাংক খাতের চাপ ও রপ্তানিতে কাঙ্ক্ষিত গতি না ফেরায় অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির সংকট পুরোপুরি কাটেনি।

মঙ্গলবার প্রকাশিত এমসিসিআইয়ের ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: এপ্রিল-জুন ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতির এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রাথমিক হিসাবে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়লেও দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার তুলনায় এই হার এখনো কম।

অর্থবছরের শেষ প্রান্তিক এপ্রিল-জুনে অর্থনীতি বেশ কিছু কাঠামোগত ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল। জুনে রপ্তানি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও পুরো প্রান্তিক ও অর্থবছরের হিসাবে পরিস্থিতি দুর্বল ছিল। উচ্চ সুদের হার ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ, ঋণের প্রবাহ এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা সীমিত থেকেছে।

একই সময়ে ব্যাংকিং খাত নানা চাপের মধ্যে ছিল। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

এমসিসিআই বলছে, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক সমন্বয় থেকে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি পর্যায় নির্দেশ করছে। এ ক্ষেত্রে বৈদেশিক খাতের স্থিতিস্থাপকতা অর্থনীতির অন্যতম ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা দিয়েছে।

মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমলেও তা এখনো বড় উদ্বেগের কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে আসে, মে মাসে যা ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৬০ শতাংশে। তবে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও জ্বালানির মূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে।

এরই মধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সেখানে দেখা গেছে, জুলাইয়ে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বৈদেশিক খাতকে অর্থনীতির সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক জায়গাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে এমসিসিআই। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে জুন সময়ে দেশে ৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। জুন শেষে বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে। মে মাসের শেষে রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার।

তবে রপ্তানি খাতে একই ধরনের ইতিবাচক চিত্র দেখা যায়নি। জুনে রপ্তানি আয় বেড়ে ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে উঠলেও পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় কমেছে শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ।

অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতার অন্যতম বড় সূচক হিসেবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধীরগতিকে চিহ্নিত করেছে এমসিসিআই। সংগঠনটির হিসাবে, ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এর আগের বছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

এর বিপরীতে একই সময়ে সরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

রাজস্ব আদায়েও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হয়েছে ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা, যা ১৭ দশমিক ৪০ শতাংশ।

সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছে ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।

তবে বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক হিসাবে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টে ৬ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে।

এর বিপরীতে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। এক বছরে বাণিজ্য ঘাটতি ৩৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে ২৭ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই ১৫ দশমিক ০২ শতাংশ কমে ১৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারে নেমেছে।

এমসিসিআই মনে করছে, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু হলেও সেটিকে টেকসই করতে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা, বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, রপ্তানিতে গতি ফেরানো এবং বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা ধরে রাখা।

সংগঠনটির মতে, এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি আরও মজবুত হবে।