ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ছাড়ার প্রশ্নে জবাব এড়িয়ে ‘কার এত জ্বালা’ বললেন হুমায়ুন

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি। বরং এ নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানতে চান, ‘কার এত জ্বালা?’

সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে হুমায়ুন কবির বলেন, তিনি বাংলাদেশি এবং দেশের জন্য কাজ করতে এসেছেন। তাঁর বাংলাদেশিত্ব বা দেশের প্রতি অবস্থান নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলবে বলে তিনি মনে করেন না।

এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য কী। জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমি বাংলাদেশি। এখানে তো বাংলাদেশি মিনিস্টার হিসেবে আছি। আমি মনে করি না আমার বাংলাদেশিত্ব নিয়ে কেউ প্রশ্ন করবে।’

এরপর সাংবাদিকেরা জানান, বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা চলছে। তখন প্রতিমন্ত্রী পাল্টা জানতে চান, ‘কে নিউজ করছে এটা?’ পরে তিনি বলেন, ‘কোন নিউজপেপার? কার এত জ্বালা?’

হুমায়ুন কবির আরও বলেন, ‘আমি তো সিটিজেন নিয়ে আছি, আপনি বলেন নেটিজেন।’ এ সময় তিনি ২০০৮ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকারের সময়কার প্রসঙ্গও টেনে আনেন।

সম্প্রতি বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় নতুন করে পাঁচজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। তাঁদের মধ্যে টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান হুমায়ুন কবির। এর আগে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

শৈশবেই পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান হুমায়ুন কবির। সেখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা ও উচ্চশিক্ষা। তিনি যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। যুক্তরাজ্য বিএনপির একাধিক নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দেশটির নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন। তবে প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগে সেই নাগরিকত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ করেছেন কি না, সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি।

বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর কাছেও হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছেন এমন তথ্য নেই বলে জানা গেছে।

বিষয়টি সামনে আসার পর তাঁর বিদেশি নাগরিকত্বের বর্তমান অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্যের সরকারি কোম্পানি নিবন্ধন সংস্থা ‘কোম্পানিজ হাউস’-এর তথ্যেও হুমায়ুন কবিরের নাম ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে উল্লেখ থাকার কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ওই তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে তাঁর আবাসস্থলও তালিকাভুক্ত রয়েছে।

‘হ্যামলেটস কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ সিআইসি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবেও তাঁর নাম ছিল। কোম্পানিজ হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের ১৮ জানুয়ারি তিনি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হন এবং একই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি পদ থেকে সরে দাঁড়ান।

হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্নের মূল কারণ বাংলাদেশের সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধান। সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকেই টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভার সদস্যদের সংখ্যা সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার অনধিক এক-দশমাংশ হতে পারে।

অন্যদিকে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য থাকবেন না। তবে আগে বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করলেও পরে তা ত্যাগ করলে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে।

এ কারণে হুমায়ুন কবির প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি আলোচনায় আসে। সাংবাদিকেরা মূলত সাংবিধানিক যোগ্যতার বিষয়টি সামনে রেখেই তাঁর কাছে নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানতে চান।

তবে প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে হুমায়ুন কবির তাঁর বাংলাদেশি পরিচয় ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেওয়া মানুষ, দেশপ্রেমিক নাগরিক, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সবাইকে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে কাজ করতে চান।

এর আগে তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। তবে প্রতিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে নাগরিকত্ব ত্যাগের নির্দিষ্ট তারিখ, প্রমাণ বা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য দেননি।