নুসরাত হত্যা মামলার রায়ে সন্তুষ্ট পরিবার, চায় নিরাপত্তা

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় হাই কোর্টের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে তার পরিবার। একই সঙ্গে আসামিদের স্বজনদের কাছ থেকে হুমকি পাওয়ার অভিযোগ তুলে পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন নুসরাতের মা শিরিন আক্তার ও ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।

সোমবার রায় ঘোষণার পর সোনাগাজীর গ্রামের বাড়িতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তারা।

নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বলেন, আদালতের প্রতি তাদের পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে এবং হাই কোর্টের দেওয়া রায়ে তারা সন্তুষ্ট। তবে রায়কে কেন্দ্র করে পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, এখন তাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিরাপত্তা। পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার পাশাপাশি বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

নুসরাত হত্যা মামলায় ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষে সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামানের হাই কোর্ট বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির মধ্যে দুজনের সাজা বহাল রাখা হয়েছে। চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং বাকি ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা দুই আসামি হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা এবং শাহাদাত হোসেন শামীম।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন নূর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি এবং জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন।

খালাস পাওয়া ১০ আসামি হলেন সোনাগাজীর সাবেক পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম, মাদ্রাসার গভর্নিং বডির তৎকালীন সহসভাপতি রুহুল আমীন এবং মহিউদ্দিন শাকিল।

রায়ের পর নুসরাতের ভাই ও মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, শুরু থেকেই তাদের পরিবার ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করে আসছিল। নিম্ন আদালতের রায়ের পর আসামিদের স্বজনদের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।

নোমান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এসব হুমকি অব্যাহত রয়েছে। পরিবারের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার জন্য সরকারের কাছে তিনি দাবি জানান।

২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার পরীক্ষা কেন্দ্রের সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে ঢাকায় এনে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ১০ এপ্রিল তিনি মারা যান।

এর আগে ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেছিলেন নুসরাত। তার মায়ের করা মামলায় ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

সিরাজ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার মুক্তির দাবিতে স্থানীয় প্রভাবশালীদের পাশাপাশি মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থীও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেয়। মামলা তুলে নিতে নুসরাত ও তার পরিবারকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।

এরপর পরীক্ষার দিন নুসরাতকে কৌশলে ছাদে ডেকে নিয়ে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর আগে নুসরাত নিজের ওপর হামলার বিষয়ে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তার মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিবাদ দেখা দেয়।

নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার দুই দিন পর তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান আটজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। নুসরাতের মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপ নেয়।

প্রথমে সোনাগাজী থানার পরিদর্শক কামাল হোসেন মামলাটি তদন্ত করেন। পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ ওঠার পর তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। ওই বছরের ২৯ মে পিবিআইয়ের পরিদর্শক শাহ আলম ১৬ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।

এদিকে হাই কোর্টের রায়কে ঘিরে নুসরাতের পরিবারের বাড়িতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। রোববার থেকেই সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

সোনাগাজী মডেল থানার ওসি আবুল হাশিম বলেন, রায়কে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি যাতে সৃষ্টি না হয়, সে জন্য নুসরাতের বাড়ির নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি পুরো এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।

তিনি জানান, নুসরাত হত্যার পর থেকেই পরিবারের বাড়িতে দুইজন পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। মামলার বাদী নোমানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রোববার থেকে সেখানে আরও সাতজন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

রায় ঘোষণার পর স্থানীয় বাসিন্দারাও স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আদালতের রায়ে দোষীদের সাজা এবং নির্দোষদের খালাস দেওয়ার বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াবে।