রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই তরুণের পরিবারের সদস্যরা তাদের সন্তানদের সম্পৃক্ততা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, সন্তানরা এমন হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে, তা তারা বিশ্বাস করতে পারছেন না। ঘটনাটির নিরপেক্ষ ও সঠিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের বাবা কানু দাসের প্রশ্ন, তার ছেলে যদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকত, তাহলে ঘটনার পরও বাড়িতে স্বাভাবিকভাবে অবস্থান করত কি না। তিনি জানান, পুলিশের কথায় নিজেই ছেলেকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে দিয়েছেন। পরে জানতে পারেন, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অন্যদিকে গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাসের মা সেনা দাসও ছেলের সম্পৃক্ততা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তার প্রশ্ন, মাত্র দুজনের পক্ষে কীভাবে একই পরিবারের চারজনকে হত্যা করা সম্ভব।
শনিবার রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি বাসা থেকে জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, তাদের পঞ্চম শ্রেণির পড়ুয়া ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী এবং স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পর রোববার ভোরে মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে মুগ্ধ দাস (২৩) ও তার মামাতো ভাইয়ের ছেলে সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) আটক করার কথা জানায় পুলিশ। সিদ্ধার্থ নগরীর পিকে জুয়েলার্সে কাজ করেন। মুগ্ধ সিটি বাজারের একটি মাছের দোকানে কর্মরত।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার গ্রেপ্তার দুজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
দুইজনকে গ্রেপ্তারের পর রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার আব্দুল মাবুদ মিয়া সাংবাদিকদের জানান, রোববার ভোরে অভিযান চালিয়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আটক করা হয়। তাদের একজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে পাশের রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুঁতবাগানে লুকিয়ে ছিলেন। পরে তুঁতবাগানের পাশের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর ওই ভবনে বসে খুনিরা ইয়াবা সেবন করেছিলেন। এ সংক্রান্ত কিছু আলামতও পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
এদিকে সোমবার নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সিদ্ধার্থ দাসের বাবা কানু দাস। তিনি বলেন, লাশ উদ্ধারের সময় তারাও ঘটনাস্থলের আশপাশে ছিলেন। গভীর রাতে পুলিশ এসে আশপাশের বাড়িগুলোর বাসিন্দাদের বিষয়ে জানতে চায়। পরে মুগ্ধের কথা জিজ্ঞাসা করে তাকে ডেকে আনতে বলা হয়।
কানু দাসের ভাষ্য, মুগ্ধ তখন তার ভাইয়ের বাসায় ঘুমিয়ে ছিলেন। তিনি পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যান এবং ছেলেকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। এরপর পুলিশ তাকে মুগ্ধকে চেনেন কি না জিজ্ঞাসা করে। সে সময় মুগ্ধের পরনে ঘিয়ে রঙের একটি গেঞ্জি ছিল। ওই পোশাক পরেই সে ঘুমিয়ে ছিল এবং পুলিশের সঙ্গে চলে যায়।
পরে পুলিশ সিদ্ধার্থকে নিয়ে মুগ্ধের বাসায় যায় বলে জানান কানু দাস। তিনি নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর জানতে পারেন, তার ছেলেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তাকে বলা হয়, ইয়াবা সেবনের পর সিদ্ধার্থ হত্যাকাণ্ডে জড়িয়েছে।
ছেলের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ বিশ্বাস করতে পারছেন না জানিয়ে কানু দাস বলেন, “আমার ছেলেতো নেশাগ্রস্ত ছিল না। এমন কোনোদিন কিছু দেখিনি। কারণবশত যদি হয়েও যায়, আমি আর কীভাবে বলব। কে কখন নেশা করে কেউ কি বলতে পারবে? কে চায় না তার ছেলে ভালো থাকুক।”
তিনি আরও বলেন, তার ছেলের বিরুদ্ধে চুরি বা এ ধরনের কোনো অভিযোগ নেই। এলাকায় সে হাসিখুশি হিসেবে পরিচিত ছিল এবং ছোটদের সঙ্গে খেলাধুলা করত।
ঘটনার আগের রাতের প্রসঙ্গ তুলে কানু দাস বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে খাবার খাওয়ার পর তিনি ছেলেকে ঘুমাতে যেতে বলেছিলেন। তখন সিদ্ধার্থের সঙ্গে থাকার কথা জানায় ছেলে। তার ভাষ্য, সিদ্ধার্থও তাদের বাড়িতে অনেক সময় থাকত। দুজন একসঙ্গে বড় হয়েছে এবং বন্ধুত্বের কারণে একে অন্যের বাসায় যাতায়াত করত।
কানু দাস বলেন, “ছেলে খুন করেছে জানলেতো আমি প্রথম থেকেই আতঙ্কিত থাকতাম। তাহলে শুক্রবার বাসায় খাওয়া-দাওয়া বা বাসায় থাকতাম কী করে।”
অন্যদিকে মুগ্ধ দাসের মা সেনা দাস বলেন, তার ছেলে নিয়মিত কাজে যেত এবং সময়মতো বাড়িতে ফিরত। তার আচরণে এমন কিছু তিনি কখনো দেখেননি, যাতে তাকে এ ধরনের অপরাধে জড়িত মনে হতে পারে।
তিনি বলেন, “আমার ছেলে নিয়মিত কাজে যেত, বাসায় আসত। ছেলে আমার এত খারাপ ছিল না। মা হয়ে আমি কিছুটাতো বুঝতে পারি। কিন্তু এখন কীভাবে কী হল সেটাই তো বুঝতে পারছি না।”
মুগ্ধ একাই এমন হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে কি না, জানতে চাইলে সেনা দাস বলেন, “ছেলে দুইটা উপযুক্ত না। নাকি এর পেছনে আরও কেউ আছে সেটা সঠিক তদন্ত করে দেখা হোক। যদি ছেলে এটা করে থাকে, তাহলে সে উচিত শাস্তি পাক। আর আমার ছেলে যদি দোষী না হয়, তাহলে তাকে ছাড়া হোক। একটা-দুইটা না চারটা মানুষকে হত্যা করা। দুইটা ছেলে কীভাবে করল, সেটাই প্রশ্ন।”
