- আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ক্যান্সারের ব্যয়বহুল ইনজেকশনের ভায়াল থেকে আসল ওষুধ বের করে তার বদলে পানি ভরে বাজারে বিক্রির অভিযোগে ভারতে একটি আন্তঃরাজ্য চক্রের সন্ধান পেয়েছে দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ। প্রায় ৯ কোটি রুপির এই চক্রের ১৭ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তে চাঞ্চল্যকরভাবে উঠে এসেছে, ভেজাল ইনজেকশনের একটি ব্যাচ রাজস্থানের সরকারি হাসপাতালেও সরবরাহ করা হয়েছিল।
ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন রাজস্থানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী গজেন্দ্র সিং খিমসার। রাজস্থান মেডিক্যাল সার্ভিসেস কর্পোরেশন লিমিটেডের (আরএমএসসিএল) মাধ্যমে রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে এসব ইনজেকশন সরবরাহ করা হয়েছিল।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া ভেজাল ইনজেকশনের চারটি ভায়াল বিকানেরের একটি সরকারি হাসপাতালেও পৌঁছেছিল। সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের আওতায় রোগীদের বিনামূল্যে বা কম খরচে দেওয়ার কথা থাকা ওষুধ কীভাবে কালোবাজারে গেল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দিল্লি পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, চক্রটির সদস্যরা প্রথমে সরকারি সরবরাহ ব্যবস্থা বা হাসপাতাল থেকে ক্যান্সারের আসল ইনজেকশনের ভায়াল সংগ্রহ করত। এরপর ভায়ালের ভেতর থেকে মূল্যবান ওষুধ বের করে সেখানে সাধারণ পানি কিংবা অন্য কোনো তরল ঢোকানো হতো। পরে ভায়ালটি এমনভাবে সিল করা হতো, যাতে বাইরে থেকে বোঝার উপায় না থাকে যে সেটিতে কারসাজি করা হয়েছে।
পরে এসব ভায়াল কালোবাজারে উচ্চ দামে বিক্রি করা হতো। চক্রটির ব্যবহৃত ওষুধের মধ্যে ছিল অ্যাভেলুম্যাব, যা ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ওষুধ। দিল্লির কালোবাজারে একটি ভায়াল প্রায় এক লাখ রুপিতে বিক্রি করা হচ্ছিল বলে তদন্তে জানা গেছে।
পুলিশ গত ২০ আগস্ট সাতটি রাজ্যে বিস্তৃত এই চক্রের কার্যক্রমের সন্ধান পাওয়ার কথা জানায়। জব্দ করা সন্দেহজনক ইনজেকশনগুলোর নমুনা সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জার্মানির মের্ক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করানো হয়।
পরীক্ষার ফলাফলে ভায়ালগুলোর মধ্যে ক্যান্সারের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় কার্যকর উপাদান পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ রোগীদের কাছে আসল ওষুধ হিসেবে যে ইনজেকশন বিক্রি করা হচ্ছিল, সেগুলোর ভেতরে কার্যত কোনো কার্যকর ওষুধই ছিল না।
এ ঘটনায় সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পাশাপাশি রোগীদের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি কর্মসূচির আওতায় বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে পাওয়ার কথা থাকা জীবনরক্ষাকারী ওষুধ পাচার হয়ে যাওয়ায় অনেক রোগী বাধ্য হয়ে কালোবাজার থেকে চড়া দামে সেগুলো কিনেছেন। এতে একদিকে রোগীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, অন্যদিকে কার্যকর ওষুধের পরিবর্তে পানি শরীরে প্রয়োগ হওয়ায় তাদের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, চক্রটির নেটওয়ার্ক শুধু দিল্লি-এনসিআর এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। মুম্বাই, হায়দরাবাদ, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশসহ ভারতের বিভিন্ন এলাকায় এর সদস্য ও সহযোগীদের কার্যক্রম ছড়িয়ে ছিল।
গত ২২ জুন গোপন সূত্রে তথ্য পাওয়ার পর তদন্ত শুরু করে পুলিশ। পূর্ব দিল্লি, রোহিণী ও মুম্বাইয়ের কয়েকটি সন্দেহজনক স্থান চিহ্নিত করা হয়। পরে গত ১১ জুলাই মাদকবিরোধী দপ্তর ও স্থানীয় পুলিশের সহযোগিতায় দিল্লি এবং নবি মুম্বইয়ের বিভিন্ন স্থানে একযোগে তল্লাশি চালানো হয়।
তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদের পর ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, তিনটি প্রধান উপায়ে চক্রটির কাছে ক্যান্সারের ওষুধ পৌঁছাত।
এর মধ্যে একটি ছিল নকল ওষুধ সংগ্রহ করা। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে হাসপাতালের ক্যান্সার রোগীদের জন্য সংরক্ষিত ওষুধ সরিয়ে নেওয়া হতো। তৃতীয়ত, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও গুদাম থেকে ওষুধ পাচার করে চক্রটির কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো।
তদন্তে আরও জানা গেছে, এসব ওষুধ বৈধ বিল, ক্রয়সংক্রান্ত নথি, ড্রাগ লাইসেন্স কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই বিভিন্ন বাড়ি ও গোপন স্থানে মজুত করা হতো। পরে দালালদের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হতো।
রাজস্থানে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার নথিপত্র যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে স্টক রেজিস্টার, ইন্ডেন্ট, ডিসপ্যাচ রেকর্ড এবং হাসপাতাল পর্যায়ে ওষুধ পৌঁছানোর যাবতীয় তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী গজেন্দ্র সিং খিমসার বলেছেন, সরকারি হাসপাতালের রোগীদের জন্য বরাদ্দ জীবনরক্ষাকারী ওষুধের বেআইনি বিক্রি কিংবা কালোবাজারি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। সরবরাহ ব্যবস্থার যেকোনো পর্যায়ে গাফিলতি, অনিয়ম বা যোগসাজশের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে সরকারি ওষুধ সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ এবং কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে রাজস্থান সরকারের স্বাস্থ্য প্রকল্পের ওষুধ কীভাবে কালোবাজারি চক্রের হাতে গেল, এর সঙ্গে কারা জড়িত এবং অন্য কোনো জীবনরক্ষাকারী ওষুধেও একই ধরনের কারসাজি করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে দিল্লি পুলিশ।
