‘ইউজড কার পার্টস’ দেখিয়ে চার বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি, ফাঁস হলো কৌশল

  • নিজস্ব প্রতিবেদক

ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশের ঘোষণা দিয়ে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের চারটি বিলাসবহুল গাড়ি দেশে আনার কৌশল শনাক্ত করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইডি)। গাড়িগুলো সম্পূর্ণ অবস্থায় না এনে বড় বড় কয়েকটি অংশে কেটে ‘ইউজড কার পার্টস’ হিসেবে মোংলা বন্দরে আনা হয়েছিল।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, চালানটিতে রেঞ্জ রোভার ভোগ, বিএমডব্লিউ ৬৫০আই, লেক্সাস এলএক্স৫৭০ ও টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেটের অংশ শনাক্ত করা হয়েছে। চারটি গাড়ির সম্ভাব্য বাংলাদেশি বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি।

এনবিআর জানায়, মোংলা বন্দরে আসা চালানটির শতভাগ কায়িক পরীক্ষা চালানো হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা নেওয়া হয়। গাড়ির পরিচয় শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তাও নেওয়া হয়েছে।

চালানটির বিল অব এন্ট্রি নম্বর C-6904, যার তারিখ ২০ এপ্রিল ২০২৬। এতে আমদানিকারক হিসেবে ঢাকার CROWN AUTO MOBILE SERVICES-এর নাম উল্লেখ করা হয়। জাপানের MAHI CAR PORT থেকে পণ্যগুলো মোংলা বন্দরে আনা হয়।

চালানে ১৪ ধরনের পণ্যের ১৬৪টি প্যাকেজ ছিল। এসব প্যাকেজের মোট ওজন প্রায় ১০ হাজার ২২০ কেজি। এর মধ্যে ব্যবহৃত গাড়ির দরজা, ২ হাজার সিসি পেট্রোল ইঞ্জিন, গিয়ার অ্যাসেম্বলি, সাসপেনশন, শক অ্যাবজর্বার, নোজ কাট, হেডলাইট, টেইল লাইট, ফেন্ডার, কেবিন, স্টিয়ারিং, বাম্পার, ডিফারেনশিয়াল ও অ্যাক্সেল অ্যাসেম্বলিসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালানটির খালাস স্থগিত করে সিআইডির খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয় ও মোংলা সার্কেলের কর্মকর্তারা। পরে গত ১৯ জুলাই চালানটির শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করা হয়।

পরীক্ষায় ঘোষিত কার পার্টসের পাশাপাশি Wiring Harness, Sensorসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সংযুক্ত অবস্থায় Front Cut, Complete Rear/Tail Cut, Front & Rear Body Cut এবং Roof Cut Panel Assembly পাওয়া যায়।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গাড়িগুলোর যন্ত্রাংশ আলাদাভাবে না এনে প্রতিটি গাড়িকে তিন থেকে চারটি বড় অংশে কেটে আমদানি করা হয়েছে। এসব অংশ পুনরায় সংযোজন করলে গাড়ির মূল কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শনাক্ত চার বিলাসবহুল গাড়ি

সিআইডির অনুসন্ধানে চালান থেকে চারটি গাড়ির অংশ শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ মডেলের রেঞ্জ রোভার ভোগ যুক্তরাজ্যে তৈরি। এর VIN নম্বর SALGA2EE9HA365609। বাংলাদেশে গাড়িটির আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

২০১০ মডেলের বিএমডব্লিউ ৬৫০আই জার্মানিতে তৈরি। এর VIN নম্বর WBALZ320X0C578880। গাড়িটির সম্ভাব্য বাজারমূল্য ৬০ থেকে ৯০ লাখ টাকা।

২০১৬ মডেলের লেক্সাস এলএক্স৫৭০ জাপানে তৈরি। এর চ্যাসিস নম্বর URJ201-4204300। গাড়িটির সম্ভাব্য বাজারমূল্য ২ কোটি থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি হতে পারে।

এ ছাড়া জাপানে তৈরি টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট GRS204 মডেলের গাড়ির অংশও শনাক্ত হয়েছে। তবে গাড়িটির নির্দিষ্ট পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এর সম্ভাব্য বাজারমূল্য ৩০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঘোষিত মূল্যের সঙ্গে প্রকৃত মূল্যের বড় পার্থক্য

কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্র জানায়, চারটি গাড়ির অংশকে ১৪ ধরনের ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে দেখিয়ে চালানটির ইনভয়েস মূল্য ঘোষণা করা হয় মাত্র ৭ হাজার ৯৩৫ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।

এই ঘোষিত মূল্যের ভিত্তিতে শুল্ক-কর দেখানো হয় প্রায় ৬ লাখ ৭ হাজার টাকা। অন্যান্য অর্থসহ মোট পরিশোধযোগ্য অর্থের পরিমাণ দেখানো হয় প্রায় ৬ লাখ ১০ হাজার টাকা। অথচ তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চালানটির সঙ্গে থাকা গাড়িগুলোর সম্ভাব্য বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর মনে করছে, গাড়ির যন্ত্রাংশের আড়ালে বড় অংশে বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির এই পদ্ধতি শুল্কায়ন এড়ানোর একটি কৌশল হতে পারে। ভবিষ্যতে একই ধরনের চালান শনাক্ত ও যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মনে করছে এনবিআর।