কক্সবাজারের হোটেল পার্কিংয়ে তিন বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ, মালিকপক্ষের দাবি ‘বাবার উপহার’

কক্সবাজারের একটি পাঁচতারকা হোটেলের পার্কিং থেকে তিনটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। গাড়িগুলোর বৈধ আমদানি ও ক্রয়সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাৎক্ষণিকভাবে দেখাতে না পারায় সেগুলো আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে গাড়ির সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের দাবি, তাদের বাবাই উপহার হিসেবে গাড়িগুলো দিয়েছেন।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘ইউজড কার পার্টস’ ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানি করে পরে সেগুলো জোড়া লাগিয়ে পূর্ণাঙ্গ গাড়িতে রূপান্তরের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকির একটি কৌশল নিয়ে তদন্ত চলছে। এরই অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গাড়ির সন্ধান করা হচ্ছে।

শুক্রবার কক্সবাজারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রেজভী আহম্মেদ।

তিনি বলেন, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানি করে সেগুলো সংযোজনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ গাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। এভাবে বিএমডব্লিউ, টয়োটা রয়্যাল স্যালুন, ক্রাউন ও রেঞ্জ রোভারসহ বিভিন্ন বিলাসবহুল গাড়িও দেশে তৈরি করে সড়কে চালানোর তথ্য পাওয়া গেছে।

জব্দ করা তিনটি গাড়ি জাপানি ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল গাড়ি বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে শুল্ক গোয়েন্দা। তবে গাড়িগুলোর সুনির্দিষ্ট মডেল, ইঞ্জিনের ক্ষমতা এবং বাজারমূল্য তদন্তের পর নির্ধারণ করা হবে।

যন্ত্রাংশের চালান নিয়ে সন্দেহ

রেজভী আহম্মেদ জানান, ২৭ আগস্ট মোংলা বন্দরে ‘ইউজড কার পার্টস’ ঘোষণা দিয়ে আনা কয়েকটি চালান নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য পায় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। চালানগুলো পরীক্ষা করে কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয়, সেখানে থাকা যন্ত্রাংশগুলো একত্র করলে অল্প সময়ের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ গাড়ি তৈরি করা সম্ভব।

তার ভাষ্য, আন্তর্জাতিক কাস্টমস বিধি অনুযায়ী কোনো পণ্যের শুল্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে সেটির ‘এসেনশিয়াল ক্যারেক্টার’ বা মৌলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করা হয়। কোনো পণ্যের প্রয়োজনীয় প্রায় সব যন্ত্রাংশ একসঙ্গে আমদানি করে পরে সংযোজনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ পণ্য তৈরি করার সুযোগ থাকলে সেটিকে চূড়ান্ত পণ্য হিসেবে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।

রেজভী আহম্মেদ বলেন, এই বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে শুল্ক ফাঁকির একটি কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে তাদের সন্দেহ। এরপর দেশের বিভিন্ন এলাকায় গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক সক্রিয় করা হয়।

চট্টগ্রামের পর কক্সবাজারে অভিযান

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের একটি আবাসিক এলাকার ভবনের পার্কিং থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিএমডব্লিউ গাড়ি জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দা। গাড়িটির বৈধ আমদানি বা ক্রয়ের পক্ষে কোনো নথি দেখাতে না পারায় সেটি জব্দ করা হয় বলে জানান রেজভী আহম্মেদ।

এরপর কক্সবাজারের একটি হোটেলে কয়েকটি গাড়ি অবস্থান করছে বলে তথ্য পায় সংস্থাটি। শুক্রবার ভোরে চট্টগ্রাম থেকে একটি দল কক্সবাজারে গিয়ে হোটেলটির পার্কিংয়ে তিনটি গাড়ির সন্ধান পায়।

রেজভী আহম্মেদ জানান, ভোর ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে অভিযানকারী দল হোটেলে পৌঁছে গাড়িগুলোর অবস্থান নিশ্চিত করে। এর মধ্যে দুটি গাড়িতে কোনো নম্বর প্লেট ছিল না। সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা গাড়িগুলো ‘রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াধীন’ বলে দাবি করলেও ‘অ্যাপ্লাইড ফর রেজিস্ট্রেশন’ লেখা বা সংশ্লিষ্ট কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।

পরে সকালে আবার প্রয়োজনীয় নথি চাওয়া হলেও সংশ্লিষ্টরা সময়ক্ষেপণ করছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এরপর আইন অনুযায়ী ডিটেনশন মেমো ইস্যু করে গাড়িগুলো জব্দ করা হয়।

গাড়িগুলো ‘বাবার উপহার’

জিজ্ঞাসাবাদে গাড়িগুলোর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, তারা গাড়িগুলো বাবার কাছ থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছেন। তবে এই দাবির সত্যতা নথিপত্র যাচাইয়ের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন শুল্ক গোয়েন্দার কর্মকর্তারা।

প্রাথমিকভাবে গাড়িগুলোর সঙ্গে থাকা তিনজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন টয়োটা সেলুন ব্র্যান্ডের ঢাকা মেট্রো গ-৩০-১২৩৪ নম্বর গাড়িটির বহনকারী মোহাম্মদ হাসিবুর রহমান সিনহা, হোন্ডা ব্র্যান্ডের ঢাকা মেট্রো গ-১৮-৯৬৩৮ নম্বর গাড়িটির বহনকারী মোহাম্মদ সাফিয়াত মাহমুদ এবং জাপানি মাজদা ব্র্যান্ডের ঢাকা মেট্রো গ-২৪-৭৩৫৯ নম্বর গাড়িটির বহনকারী মোহাম্মদ সারাফাত রহমান ঈশান।

তাদের জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্টের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজও নেওয়া হয়েছে। তবে জব্দ করা গাড়িগুলোর প্রকৃত মালিক কে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলতে রাজি হননি শুল্ক গোয়েন্দার কর্মকর্তা।

মূল্য নির্ধারণ হবে তদন্তের পর

জব্দ করা গাড়িগুলোর সম্ভাব্য মূল্য সম্পর্কে জানতে চাইলে রেজভী আহম্মেদ বলেন, গাড়ির বাজারমূল্য নির্ধারণে শুল্ক গোয়েন্দারা বিশেষজ্ঞ নন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, একটি বিএমডব্লিউ গাড়ির দাম ৮০ লাখ টাকা থেকে সাত কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আবার ইঞ্জিনের ক্ষমতা ৪ হাজার সিসির বেশি হলে শুল্কের হারও ভিন্ন হয়।

জাপানি গাড়ির মূল্য নির্ধারণে ‘ইয়েলো বুক’ অনুসরণ করা হয় বলেও জানান তিনি। প্রাথমিকভাবে জব্দ করা গাড়িগুলোকে স্পোর্টস কার ও বিলাসবহুল গাড়ি বলে মনে হচ্ছে।

আমদানি থেকে সংযোজন, সবই তদন্তের আওতায়

শুল্ক গোয়েন্দার কর্মকর্তারা বলছেন, এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো গাড়িগুলো কীভাবে দেশে এসেছে এবং কোথায় সংযোজন করে পূর্ণাঙ্গ গাড়িতে রূপ দেওয়া হয়েছে, তা বের করা।

রেজভী আহম্মেদ বলেন, গাড়িগুলোর আমদানি প্রক্রিয়া, দেশে প্রবেশের বৈধতা এবং কোথায় সেগুলো অ্যাসেম্বল করা হয়েছে, সবকিছু খতিয়ে দেখা হবে।

তদন্তে আমদানি প্রক্রিয়ায় অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চোরাচালানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সব আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এর পেছনে থাকা নেটওয়ার্কও শনাক্ত করা হবে।

আমদানি অবৈধ প্রমাণিত হলে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন ও মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়ও তদন্তে আসতে পারে। একইভাবে গাড়ির ব্র্যান্ড নকলের প্রমাণ পাওয়া গেলে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে।

গাড়ির সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের পেশা বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুল্ক গোয়েন্দার তদন্তের বিষয় নয় বলে জানান রেজভী আহম্মেদ।

অভিযানে র‍্যাব, কক্সবাজার জেলা পুলিশ এবং বিভিন্ন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সহযোগিতা করেছেন। পুরো অভিযানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

রেজভী আহম্মেদ আরও বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান বিষয়টি সরাসরি তদারক করছেন এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের মাধ্যমে তারা নিয়মিত নির্দেশনা পাচ্ছেন।

জব্দ করা গাড়িগুলো শুল্ক গোয়েন্দার হেফাজতে নেওয়া হচ্ছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর গাড়িগুলোর বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হবে।

বিদেশি কোনো নাগরিক এই ঘটনায় জড়িত কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় শুক্রবার পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির উপপরিচালক প্রণয় চাকমা।