- বেনাপোল প্রতিবেদক
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে গেছে। গন্তব্যভেদে ট্রাকপ্রতি ভাড়া ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এতে আমদানি-রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীদের পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি পণ্যের দামও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পণ্যবাহী ট্রাক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রতিদিন ৩৫০ থেকে ৪০০টি ট্রাক আমদানি পণ্য নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে যায়। পাশাপাশি রপ্তানি পণ্য নিয়ে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি ট্রাক চলাচল করে।
রোববার রাতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ নতুন জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। নতুন দর অনুযায়ী ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বেড়েছে। ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকা লিটারে।
জ্বালানির দাম বাড়ার পর সোমবার সকাল থেকে বেনাপোল বন্দরে ট্রাকভাড়া নিয়ে চালক, মালিক, আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে দর-কষাকষি ও বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।
বেনাপোল থেকে ঢাকায় ১৫ টন পণ্য পরিবহনে আগে ট্রাকভাড়া ছিল ২১ থেকে ২২ হাজার টাকা। জ্বালানির নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর একই পণ্যের জন্য ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম রুটে আগে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও এখন তা বেড়ে ৩৪ থেকে ৩৫ হাজার টাকা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ রুটেও ভাড়া ২২-২৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২৭-২৮ হাজার টাকা হয়েছে।
বেনাপোল ল্যান্ড পোর্ট ইমপোর্টার অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, বেনাপোল দেশের অন্যতম প্রধান স্থলবন্দর। প্রতিদিন এই বন্দর দিয়ে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাক মালিকরা ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ায় ব্যবসায়ীরা নতুন করে চাপে পড়েছেন।
তিনি বলেন, তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে আমদানি-রপ্তানি পণ্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠাতে পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এতে ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
বেনাপোল বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনকারী ট্রাকচালক খায়রুল ইসলাম বলেন, ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়েছে। এ কারণে ট্রিপপ্রতি ট্রাকভাড়া ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় সমন্বয় করতে ভাড়া বাড়ানো ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ নেই।
আরেক চালক শরিফুল ইসলাম বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার পর নতুন করে ভাড়া নির্ধারণ করতেও তাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। পরিবহন খরচ বাড়ার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সব ধরনের পণ্যের দামের ওপর পড়বে বলে তিনি মনে করেন।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক বলেন, পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দিন গাজি বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি পাম্পগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি না পাওয়ায় পরিবহন খাতে সংকট তৈরি হয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লে ট্রাকভাড়া বাড়বে, এটিই স্বাভাবিক।
তিনি আরও বলেন, অনেক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ীদের বাৎসরিক চুক্তি রয়েছে। ফলে হঠাৎ জ্বালানির দাম বাড়ায় এসব চুক্তির আওতায় পণ্য পরিবহনে অনেক ব্যবসায়ী লোকসানে পড়ছেন। এর সঙ্গে টায়ার, ট্রাকের যন্ত্রাংশ ও ফেরি ভাড়ার খরচও বেড়েছে।
বেনাপোলের সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও পরিবহন সংকটের কারণে ট্রাকভাড়া স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেড়েছে। আমদানিকারকরা লাভের আশায় পণ্য আনলেও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তাদের লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকা কাঁচা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য অনেক ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে বন্দর থেকে খালাস করে নিয়ে যাচ্ছেন। তেলের দাম, ফেরি ভাড়া ও অন্যান্য পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ট্রাক সংকটও ভাড়া বাড়ার অন্যতম কারণ।
ট্রাক মালিকদের ভাষ্য, বেনাপোল থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্য নিয়ে যাওয়ার পর অনেক সময় ফেরার পথে পর্যাপ্ত ভাড়া পাওয়া যায় না। ফলে দুই দিকের খরচ সমন্বয় করতে গন্তব্যভেদে একমুখী ভাড়া বাড়াতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় এভাবে বাড়তে থাকলে আমদানি করা পণ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের বাজারমূল্যও বাড়তে পারে। এতে একদিকে ব্যবসায়ীদের ব্যয় বাড়বে, অন্যদিকে এর অতিরিক্ত চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
