জাতিসংঘে রোহিঙ্গা সংকট ও জলবায়ু ইস্যু তুলে ধরবেন তারেক রহমান

  • নিউইয়র্কে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অংশ নিতে যাওয়া তারেক রহমানের সফরে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক বৈষম্য, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরবেন তিনি।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল ৬টা ৫ মিনিটে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও সফরসঙ্গীদের নিয়ে তুর্কি এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে যাত্রাবিরতি শেষে স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ১০ মিনিটে নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। নিউইয়র্ক সময় বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটে জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন জুবাইদা খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানোর কথা রয়েছে। সফরকালে তিনি নিউইয়র্কের হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল হোটেলে অবস্থান করবেন।

প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরকে সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও কূটনৈতিক অগ্রাধিকার তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে তার আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি। ওইদিন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত বিশ্বনেতাদের স্বাগত প্রাতরাশে অংশ নেবেন তিনি। এরপর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী কার্যক্রমে যোগ দেবেন এবং সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের দেওয়া অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

সফরের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার থাকবে রোহিঙ্গা সংকট। ২৩ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত বিশেষ পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, টেকসই ও দ্রুত প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চাইবেন প্রধানমন্ত্রী। রোহিঙ্গা সংকটের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে কূটনৈতিক আলোচনা করার কথাও রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনও থাকবে সফরের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্যসূচিতে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন সহায়তা, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়গুলো বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরবে। বৈশ্বিক বৈষম্য মোকাবিলার বিষয়েও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী।

২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক পর্বে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে তারেক রহমানের। এটিই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণ। সেখানে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, আইনের শাসন, জবাবদিহি, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নারী ও যুবসমাজের ক্ষমতায়ন এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ইস্যু তুলে ধরার কথা রয়েছে।

একই দিনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত ঝুঁকি মোকাবিলাবিষয়ক একটি উচ্চপর্যায়ের সভায়ও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে।

জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে একাধিক দেশের সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন তারেক রহমান। পাকিস্তান, কুয়েত, ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড ও হাইতির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে। এসব আলোচনায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় স্থান পাবে।

এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে ওয়াল স্ট্রিট, মেটা এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন তিনি। এসব আলোচনায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ, উৎপাদন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ ও কর্মসংস্থানের বিষয় তুলে ধরা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেছেন, সফরটি আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনের পরিবর্তে দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সাজানো হয়েছে। নিউইয়র্কে অবস্থানের স্বল্প সময়ের মধ্যেই ধারাবাহিক দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য আরও একটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তারেক রহমানের এই ভাষণের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে একই পরিবারের তৃতীয় প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর উপস্থিতি ঘটছে। এর আগে তাঁর বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এবারের সফরে ৩৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রয়েছে বলে জানা গেছে। তাঁর সঙ্গে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানও রয়েছেন। প্রতিনিধি দলে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রয়েছেন।

নিউইয়র্কে কয়েক দিনের কর্মসূচি শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। জাতিসংঘের এই সফরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে অবস্থান তুলে ধরার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।