ডেঙ্গুতে প্রাণ গেল চার বছরের লামিয়ার, সীতাকুণ্ডে বাড়ছে আতঙ্ক

  • নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চার বছরের শিশু লামিয়া আক্তারের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। শিশুটির মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একই এলাকায় একাধিক ব্যক্তি জ্বরে আক্রান্ত থাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার সকালে সীতাকুণ্ড উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সারপাড়া এলাকায় লামিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে শুকাতে দেওয়া হয়েছে শিশুটির ব্যবহৃত কয়েকটি পোশাক। ঘরের ভেতর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে আছে পরিবেশ।

লামিয়া ওই এলাকার বাসিন্দা ইমাম হোসেন ও সুমি আক্তার দম্পতির একমাত্র মেয়ে। গত বৃহস্পতিবার হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

শিশুটির মা সুমি আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার মেয়েটা কিছু খেতে চাইছিল না। আদর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করছিলাম। খাওয়ানোর পরই বমি করে দেয়। আমার মেয়েটা আমাকে ছেড়ে চলে গেল। এখন কাকে খাওয়াব?’

মেয়ের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা ইমাম হোসেনও। তিনি জানান, প্রতি শুক্রবার মেয়েটি তার সঙ্গে মসজিদে যেত। কিছুদিন ধরে মেয়েটি বারবার বলত, ‘আব্বু, আমি আল্লাহর কাছে চলে যাব।’ তবে এমন কথা যে সত্যি হয়ে যাবে, তা তিনি ভাবতে পারেননি।

ইমাম হোসেন বলেন, তার মেয়ে ঘুরতে খুব ভালোবাসত। সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকত এবং পোশাক নিয়ে তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। নতুন পোশাক পরতে পছন্দ করত। এখন মেয়ের জন্য নতুন পোশাক কেনার কথাও তাকে কাঁদিয়ে তুলছে।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, ইমাম হোসেন কয়েক দিন ধরে জ্বরে ভুগছিলেন। সুস্থ হওয়ার একদিন পর তার মেয়ের জ্বর আসে। প্রথম দিকে এক-দুই দিন সর্দি-কাশি ছিল। পরে গত সোমবার জ্বর বাড়ে। বুধবার সকাল থেকে লামিয়া কিছু খাচ্ছিল না।

চিকিৎসকের পরামর্শে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করানো হলে বৃহস্পতিবার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। সেদিন সকাল থেকেই শিশুটি পরপর দুবার কালো রঙের বমি করে। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়।

ইমাম হোসেন জানান, তারা বিআইটিআইডি হাসপাতালের দিকে যাচ্ছিলেন। ভাটিয়ারীতে পৌঁছানোর পর মেয়েটির খিঁচুনি শুরু হয়। কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও হাসপাতালের সামনে পৌঁছানোর পর আবার খিঁচুনি শুরু হয়। এরপরই তার মৃত্যু হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ইমাম হোসেন স্থানীয় একটি স্টিল রি-রোলিং মিলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। টিনশেডের কাঁচা ঘরে স্ত্রী, মা ও তিন ভাইকে নিয়ে তার পরিবার বসবাস করে। বাড়িটিতে সারিবদ্ধভাবে চারটি ঘর রয়েছে।

এলাকায় গিয়ে জানা যায়, একই বাড়িতে বর্তমানে অন্তত নয়জন জ্বরে আক্রান্ত। তাদের মধ্যে ইমাম হোসেনের দুই ভাই ও মা রয়েছেন। কারও তিন দিন, আবার কারও পাঁচ দিন ধরে জ্বর চলছে। আক্রান্তদের বেশির ভাগই ডেঙ্গু পরীক্ষা করাননি।

স্থানীয় বাসিন্দা আম্বিয়া খাতুন বলেন, একই বাড়িতে একসঙ্গে এত মানুষের জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা আগে কখনো দেখেননি।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়ির প্রতিটি ঘরের সামনে বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখার জন্য বালতি ও ড্রাম রাখা রয়েছে। খোলা এসব পাত্রের জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এক নারী জানান, গরুকে পানি খাওয়ানোর জন্য এসব পাত্রে পানি জমিয়ে রাখা হয়। জমে থাকা পানিতে মশার বিস্তার ঘটতে পারে, সে বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন না।

গত ১৫ দিনে সীতাকুণ্ডে তিন শিশুসহ পাঁচজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর সোনাইছড়ি ইউনিয়নের ফুলতলা গ্রামের চার বছরের শিশু মো. মোজাহিদুল ইসলাম ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।

এর এক সপ্তাহ পর ১৫ সেপ্টেম্বর ভাটিয়ারী ইউনিয়নের তুলাতলী গ্রামের ২৪ বছর বয়সী মো. রাসবানের মৃত্যু হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ড পৌরসভার আমিরাবাদ এলাকায় সিরাজুম মুনিরা নামে পাঁচ বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়। গত মঙ্গলবার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের কাজীপাড়া এলাকায় কোরবান আলী রিফাত (১৭) নামে এক কিশোরেরও মৃত্যু হয়।

এদিকে, স্থানীয়দের মধ্যে জ্বর ও ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও বাড়িঘরের আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ ও মশার বংশবিস্তার রোধে কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন এলাকাবাসী।