দশম গ্রেডে বেতনসহ তিন দফা দাবিতে রাজধানীতে আন্দোলনরত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে অন্তত ১২৫ জন আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
শনিবার রাতের দিকে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (কাশেম–শাহিন) এর সভাপতি মো. আবুল কাশেম এবং শিক্ষক নেতা মুহিব উল্লাহ জানান, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং অনেকেই ভর্তি আছেন। “আমরা আহত শিক্ষকদের তালিকা তৈরি করছি,” বলেন মুহিব উল্লাহ।
শনিবার সকাল থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে শিক্ষকরা। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে তারা ‘কলম বিরতি কর্মসূচি’ পালনের জন্য মিছিল নিয়ে শাহবাগমুখী হলে ৪টার দিকে পুলিশ তাদের শাহবাগ থানার সামনে থামিয়ে দেয়। সেখানে সাউন্ড গ্রেনেড, জলকামান, কাঁদুনে গ্যাস ও লাঠিচার্জের ঘটনার পর শিক্ষকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। এতে বহু শিক্ষক আহত হন এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করেন সংগঠনের নেতারা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর মো. ফারুক রাত পৌনে ৮টার দিকে জানান, অন্তত ১২৫ জন আহত শিক্ষক চিকিৎসা নিয়েছেন এবং কয়েকজন ভর্তি আছেন।
ঘটনার পর শিক্ষক সংগঠনের সভাপতি আবুল কাশেম শহীদ মিনারে ফিরে এসে ঘোষণা দেন—রোববার থেকে সারাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালিত হবে। পাশাপাশি ঢাকায় চলমান অবস্থান কর্মসূচিও অব্যাহত থাকবে।
তিনি দেশের সব প্রাথমিক শিক্ষককে ঢাকায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমাদের দাবি পূরণ ও গ্রেপ্তার শিক্ষকদের মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে। প্রত্যেক শিক্ষক যেন এই আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করেন।”
দশম গ্রেডে বেতন দাবি ছাড়াও বাকি দুই দাবি হলো— চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পর উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তিতে জটিলতা দূর করা এবং শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির নিশ্চয়তা প্রদান।
অন্যদিকে, পুলিশ দাবি করেছে কেউ আটক হয়নি। ডিএমপি মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, “বিকাল ৪টার দিকে কিছু আন্দোলনকারী পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ বাধা দিলে তারা ইটপাটকেল ছুড়ে মারে, এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করা হয়।”
তিনি আরও জানান, যমুনা ভবন ও আশপাশের এলাকায় সভা–সমাবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও শিক্ষকরা তা অমান্য করে সামনে এগোনোর চেষ্টা করেন, যার ফলে জননিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়।
‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’ নামে চারটি সংগঠনের যৌথ প্ল্যাটফর্মের ব্যানারে এই কর্মসূচি চলছে। এর অন্তর্ভুক্ত সংগঠনগুলো হলো—‘বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (কাশেম–শাহিন)’, ‘প্রাথমিক শিক্ষক দশম গ্রেড বাস্তবায়ন পরিষদ’, ‘বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতি’ এবং ‘বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (শাহিন–লিপি)’।
দেশে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৭টি এবং এসব প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ৩ লাখ ৮৪ হাজার শিক্ষক কর্মরত আছেন।
গত ২৪ এপ্রিল সরকার প্রধান শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে এবং সহকারী শিক্ষকদের ১৩তম থেকে ১২তম গ্রেডে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয়। তবে এই সিদ্ধান্তে সহকারী শিক্ষকরা অসন্তুষ্ট থেকে দশম গ্রেডে বেতনসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে ‘প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদ’ ব্যানারে থাকা আরেক অংশের শিক্ষকরা একাদশ গ্রেডে বেতন, উচ্চতর গ্রেডে জটিলতা নিরসন এবং শতভাগ পদোন্নতির দাবিতে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন।
তারা জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অগ্রগতি না হলে ২৩ ও ২৪ নভেম্বর অর্ধদিবস, ২৫ ও ২৬ নভেম্বর পূর্ণদিবস কর্মবিরতি এবং ২৭ নভেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন। দাবি পূরণ না হলে ১১ ডিসেম্বর থেকে আমরণ অনশনও শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
