বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মঙ্গলবার ভোর ৬টায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন এই খবর নিশ্চিত করেছেন। খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরেই লিভার সংক্রান্ত জটিলতা, কিডনি সংক্রান্ত জটিলতা, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, আথ্রাইটিস ও ইনফেকশনজনিত সমস্যাসহ বিভিন্ন জটিল স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন। গত ২৩ নভেম্বর থেকে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
মৃত্যুর সময় হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন তার ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তারেকের স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, প্রয়াত ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান ও তার দুই মেয়ে জাহিয়া রহমান ও জাফিয়া রহমান, খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার ও তার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা, প্রয়াত ভাই সাইদ এস্কান্দারের স্ত্রী নাসরিন এস্কান্দার, বোন সেলিনা ইসলামসহ পরিবারের সদস্যরা এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
রাত ২টার দিকে অধ্যাপক জাহিদ হোসেন জানিয়েছিলেন যে খালেদা জিয়া ‘অত্যন্ত সঙ্কটময়’ সময় অতিক্রম করছেন এবং দেশবাসীর কাছে তার সুস্থতার জন্য দোয়া চেয়েছিলেন। এর কয়েক ঘণ্টা পরে ভোর ৬টায় তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীদের অনেকেই এই খবরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। খবরটি মুহূর্তের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে এবং বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা হাসপাতালের বাইরে জড়ো হতে শুরু করেন।
সকাল ৯টায় খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদার সাংবাদিকদের সামনে এসে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, “দীর্ঘ এক মাস ১০ দিন বিভিন্ন চিকিৎসা করে উনাকে সুস্থ করার জন্য আমাদের আপ্রাণ চেষ্টা ছিল, বাট আমি মেডিকেল বোর্ডের পক্ষ থেকে আজ ভোর ৬টায় উনাকে ক্লিনিক্যালি ডেড ঘোষণা করেছিলাম। আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে উনার জন্য দোয়া চাই।”
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ সময় বলেন, “এই সংবাদটি নিয়ে আপনাদের সামনে দাঁড়াতে হবে, এটা আমরা কখনো ভাবিনি। এই শোক, এই ক্ষতি… এটা অস্বাভাবিক, অপূরণীয়। এই জাতি কোনোদিন পূরণ করতে পারবে না।” তিনি জানান, অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস ফোন করেছিলেন এবং সকাল সাড়ে ১০টায় স্পেশাল ক্যাবিনেট মিটিংয়ে খালেদা জিয়ার শেষকৃত্য, দাফন ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটিরও বৈঠক হবে এবং সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে বিস্তারিত কর্মসূচি জানানো হবে।
বিএনপি সাত দিনের শোক ঘোষণা করেছে। এই সময় দলীয় সকল কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে, নেতাকর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করবেন এবং প্রতিটি দলীয় কার্যালয়ে সাতদিন ব্যাপী কোরআন খতম ও দোয়ার আয়োজন করা হবে। নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে শোকবই খোলা হবে।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এক শোকবার্তায় খালেদা জিয়াকে দেশের ইতিহাসের ‘গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে জাতি তার এক মহান অভিভাবককে হারাল।” তিনি বলেন, “বাংলাদেশে গণতন্ত্র, বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তার ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।… দেশ ও জাতির প্রতি তার অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।” ইউনূস খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু করার বিষয়টিকে নারী শিক্ষার মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, “১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর অর্থনৈতিক উদারীকরণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির একটি মজবুত ভিত্তি স্থাপন করেন খালেদা জিয়া।”
খালেদা জিয়ার জীবন ও রাজনৈতিক পথচলা:
১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট জলপাইগুড়িতে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়ার (পারিবারিক নাম খালেদা খানম, ডাকনাম পুতুল) পৈতৃক নিবাস ফেনী জেলায়। ভারত ভাগের পর তার পরিবার দিনাজপুরে স্থায়ী হন। ১৯৬০ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান বিএনপি গঠন করলে দল গঠনে তার ভূমিকা রাখেন খালেদা জিয়া। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর, একজন গৃহবধূ হিসেবে তিনি রাজনীতিতে সরাসরি প্রবেশ করে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৮৩ সালে তার নেতৃত্বে গঠিত সাতদলীয় জোট স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে প্রধান ভূমিকা পালন করে। এই আন্দোলনে অন্যান্য দলের সঙ্গে আপস না করায় তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধা পান।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জীবনের প্রথম ভোট দিয়ে পাঁচটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতেই জয়লাভ করেন তিনি এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচন ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও তিনি পাঁচটি করে আসনে জয়ী হন। ২০০১ সালে জামায়াত-ই-ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির সঙ্গে গঠিত চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে তিনি পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি পাঁচবার সংসদ সদস্য, তিনবার প্রধানমন্ত্রী এবং দুইবার বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বাধীন বিএনপি ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকে আর সংসদে সরকার গঠন করতে পারেনি।
২০০৭ সালে জরুরি অবস্থায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০০৮ সালে মুক্তি পেয়ে তিনি দেশ ছেড়ে যেতে অস্বীকার করেন। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনি কারাবরণ করেন। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ করোনা মহামারীর প্রেক্ষাপটে সরকারের এক নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান, যা তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে দেয়নি এবং গুলশানের বাসায় সীমিত থাকতে বাধ্য করেন। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর ৭ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশে তিনি পূর্ণ মুক্তি লাভ করেন এবং পরে উচ্চ আদালত তাকে জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা দুটি থেকে খালাস দেন।
স্বাস্থ্যজনিত কারণে তিনি সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর সেনাকুঞ্জে একটি অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে আসার পর ২৩ নভেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হন। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ নেওয়ার কথা ভাবা হলেও তার স্বাস্থ্য অবস্থার কারণে তা সম্ভব হয়নি। ২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর তার ছেলে তারেক রহমান দীর্ঘ ১৮ বছর নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরে হাসপাতালে মায়ের সাথে দেখা করেন। ৩০ ডিসেম্বর সকালে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৩, ফেনী-১ ও দিনাজপুর-৩ আসনে তার পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পরের দিন, তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
