নবম বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নির্ধারণ করবে পরবর্তী সরকার: জ্বালানি উপদেষ্টা

সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন দুই থেকে আড়াই গুণ বাড়ানোর নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি বলেছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এই সুপারিশ বাস্তবায়নের সুযোগ দেখা যাচ্ছে না। তবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে তিনি এসব মন্তব্য করেন।

নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে ফাওজুল কবির খান বলেন, “বাস্তবায়নের সময়টা কোথায়? এখন তো মাত্র কয়েকটা (দিন), একটা কমিটি করা হয়েছে। কমিটি সেটা পরীক্ষা করবে, কমিটি পরে সেটা সুপারিশ করবে। পরবর্তী সরকার তো ‘স্বাধীনভাবে যেকোনো কিছু করতে পারে’। কারণ আমরা যেরকম… এই সরকার যেরকম একটা নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, পরবর্তী সরকার তো একইভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত। ওরা তো যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।”

গত বুধবার নবম জাতীয় বেতন কমিশন প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের প্রতিবেদন দাখিল করে। কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছে। কমিশন বর্তমানের মতোই সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০টি স্কেলে বেতন সুপারিশ করে।

জ্বালানি উপদেষ্টা দাবি করেছেন, এই সুপারিশ প্রণয়নের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতিসহ সরকারি কর্মীদের দাবি-দাওয়া আমলে নেওয়া হয়েছে। এই সুপারিশ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য বাড়তি এক লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে বলে কমিশন প্রতিবেদন হস্তান্তরের সময় জানিয়েছিল। এ অর্থ যোগানে নতুন সরকারের ওপর চাপ তৈরি করবে কি না, এমন প্রশ্নে জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, “প্রথম কথা হচ্ছে যে এক লাখ কোটি টাকা, সেটা হচ্ছে সর্বোচ্চ ব্যয় যদি পে-কমিশনের রিপোর্ট হুবহু বাস্তবায়ন করা হয়। দ্বিতীয় যে প্রশ্নটা সেটা হচ্ছে যে যদি একই সময়ে বাস্তবায়ন করা হয়। আমি অতীতে যেহেতু সরকারি কর্মচারী ছিলাম, আমরা জানি যে এ ধরনের পে-কমিশন একসাথে বাস্তবায়িত হয় না, এগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হয়।”

তিনি আরও বলেন, “সুতরাং, এসব প্রশ্নগুলো ওই যে কমিটি করা হয়েছে সে কমিটি দেখবে। আর্থিক সংস্থানের বিষয়টিও তাদের বিবেচনায় থাকবে এবং সম্ভবত এটা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হবে।”

তিনি দাবি করেন যে বেতন কমিশনের সুপারিশ বরং পরবর্তী সরকারের কাজ ‘সহজ’ করবে। ফাওজুল কবির খান বলেন, “না, এটা চাপ হবে না। এটা বরং… আপনাদের একটা জিনিস বুঝতে হবে, সেটা হচ্ছে যে আমরা তো একটা ‘সীমিত সময়ের’ সরকার। ওই জন্য আমরা কিন্তু এখন অনেক কাজ করছি, যাতে আগামী সরকার উপকৃত হয়। যেমন ধরেন, আমি যদি জ্বালানি খাতের বলি, আমরা একটা পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি মাস্টার প্ল্যান করছি। আমি জানি যে এটা বাস্তবায়ন করতে পারব না, করার সময় নেই।”

তিনি আরও যোগ করেন, “পরবর্তী সরকারের কাজ সহজ করার জন্যই পে-কমিশনের কাজ করা হয়েছে। কারণ একই জিনিস হবে কি যে আমরা যেটা চাই নাই, সেটা হচ্ছে যে এই পে-কমিশনের জন্য একটা অশান্তি হচ্ছিল। আপনারা জানেন যে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে একটা বিক্ষোভ ছিল নানা রকম। তো যাতে নতুন সরকার, যাতে এসে এ ধরনের একটা অচলাবস্থার সম্মুখীন না হয়। আমরা চাচ্ছি যে নতুন যে সরকার আসবে তাদের যাতে যাত্রাপথটা সহজ হয়—যে-ই আসুক না কেন, যে সরকারই আসুক।”

এ সুপারিশের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার সুযোগ নেই বলেও জ্বালানি উপদেষ্টা দাবি করেন। তিনি বলেন, “জিনিসের দামের তো প্রভাব পড়ার কোনো কারণ নাই। কারণ হচ্ছে, আমরা তো এটা বাস্তবায়ন করছি না। এটা পরিষ্কার। এটা মাত্র একটা কমিটি করা হয়েছে। সুপারিশ গ্রহণ করা হয় নাই। শুধুমাত্র রিপোর্টটা গ্রহণ করা হয়েছে এবং সুপারিশগুলো পরীক্ষা করার জন্য একটা কমিটি শুধুমাত্র করা হয়েছে।”

বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের বার্ষিক ব্যয় হচ্ছে এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। গত ২৭ জুলাই সরকার ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে এবং ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করে। পরে সময় বাড়িয়ে এর জন্য আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হয়। সে হিসেবে তিন সপ্তাহ আগে প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে অষ্টম বেতন কমিশন গঠন হয়েছিল। দীর্ঘ ১২ বছর পর আবার এই কমিশন গঠিত হয়।