ওয়াশিংটন পোস্টের প্রধান নির্বাহী পদত্যাগ করলেন, ব্যাপক ছাঁটাই ও বিতর্কের মধ্যে সংকটকাল

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও প্রকাশক উইল লুইস অবিলম্বে পদত্যাগ করেছেন।

সংবাদপত্রটি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। লুইসের পদত্যাগের এ সিদ্ধান্ত এসেছে মূলত প্রতিষ্ঠানটিতে সম্প্রতি বড় আকারের কর্মী ছাঁটাইয়ের পর পাঠক ও কর্মীদের তীব্র ক্ষোভ এবং আর্থিক ক্ষতি ও সম্পাদকীয় হস্তক্ষেপের অভিযোগের মধ্যে।

সংবাদপত্রটির ঘোষণা অনুযায়ী, লুইসের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন জেফ ডি’ওনোফ্রিও, যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টাম্বলারের সাবেক সিইও এবং গত বছর থেকে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার নিয়োগও অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।

উইল লুইস তাঁর সহকর্মীদের পাঠানো একটি ই-মেইলে পদত্যাগের পেছনের কারণ হিসেবে বলেছেন, “আমার জন্য সরে দাঁড়ানোর এটাই উপযুক্ত সময়।” গত মঙ্গলবার ঘোষিত বড় ধরনের ছাঁটাইয়ের ঘটনাটি এই সিদ্ধান্তের পটভূমি তৈরি করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৮০০ সাংবাদিকের মধ্যে প্রায় ৩০০ জনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন ইউক্রেনের কিয়েভ ব্যুরোর প্রতিনিধি, মধ্যপ্রাচ্য ব্যুরোর পুরো দল এবং স্থানীয়, ক্রীড়া ও গ্রাফিকস বিভাগের ব্যাপক সংখ্যক কর্মী। এছাড়া, প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত পডকাস্ট ‘পোস্ট রিপোর্টস’ স্থগিত করা হয়েছে। এই ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে পত্রিকাটির সদর দপ্তরের সামনে শত শত মানুষ বিক্ষোভ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্র শিল্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞাপন আয় হ্রাস এবং গ্রাহক সংখ্যা কমে যাওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখে থাকলেও, ওয়াশিংটন পোস্টের ক্ষেত্রে দু’বছরেরও কম সময়ের নেতৃত্বে লুইসের ব্যবস্থাপনা গ্রাহক এবং সংবাদকর্মী উভয় পক্ষ থেকেই ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। তাঁর নেওয়া বিভিন্ন আর্থিক কাটছাঁট ও পুনর্গঠনের পদক্ষেপ বিতর্ক তৈরি করে।

এছাড়া, মালিক জেফ বেজোস এবং সিইও লুইসের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের সম্পাদকীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের গুরুতর অভিযোগ ওঠে। গত নভেম্বর মাসে, ২০২৪ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে, পত্রিকাটির উদারপন্থী সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী কমলা হ্যারিসের প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থন প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই তৎকালীন রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সম্পাদকীয় নীতির পরিবর্তনের পর প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ডিজিটাল গ্রাহক তাদের সদস্যতা বাতিল করেন এবং ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১০ কোটি ডলার ক্ষতির মুখোমুখি হয়।

ওয়াশিংটন পোস্টের হোয়াইট হাউস ব্যুরো প্রধানের শেয়ার করা এক বার্তায় লুইস দাবি করেন যে, “ওয়াশিংটন পোস্টের টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এবং আগামী দীর্ঘ সময় মানসম্পন্ন ও নিরপেক্ষ সংবাদ প্রকাশ অব্যাহত রাখতেই আমার মেয়াদে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।” তবে, পত্রিকাটির সাবেক নির্বাহী সম্পাদক মার্টি ব্যারন এই গণছাঁটাইকে “বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার দিনগুলোর একটি” বলে আখ্যায়িত করেন।

অন্যদিকে, ছাঁটাইয়ের পরের দিন পত্রিকাটির বর্তমান নির্বাহী সম্পাদক ম্যাট মারে সাক্ষাৎকারে জানান, মালিক জেফ বেজোস এখনো ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং চান এটি “আরও বড়, সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান” হয়ে উঠুক। মারে বেজোসকে একজন নিখুঁত মালিক হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, তিনি সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করেন না। তবে, প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মী এ ধারণা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন এবং প্রশ্ন তোলেন যে, খরচ কমানোর এই কঠোর পন্থা দিয়ে কি প্রতিষ্ঠানকে সত্যিকার অর্থে বড় করা সম্ভব। কর্মীদের প্রতিনিধি সংস্থা ‘দ্য পোস্ট গিল্ড’ এক বিবৃতিতে বলেছে, “যদি জেফ বেজোস আর সেই লক্ষ্যে বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক না হন, তবে পত্রিকাটির জন্য নতুন একজন অভিভাবকের প্রয়োজন।”

২০১৩ সালে ২৫ কোটি ডলারে ওয়াশিংটন পোস্ট কিনে নেওয়া জেফ বেজোস ব্যক্তিগতভাবে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনাকে বার্ষিক লোকসান কমানো এবং আবারও লাভজনক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার একটি টেকসই পথ বের করার পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে, বেজোস ছাঁটাই বা প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। মারে তাঁর সঙ্গে সর্বশেষ কবে কথা হয়েছে, তা জানাতে অস্বীকার করেছেন।