চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান ধর্মঘটজনিত অচলাবস্থা নিরসনের জন্য সরাসরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে খোলা চিঠি পাঠিয়েছে দেশের চারটি প্রধান ব্যবসায়ী সংগঠন।
তারা সতর্ক করে দিয়েছেন, বন্দর অচল থাকায় তৈরি পোশাকসহ দেশের সব ধরনের প্রধান রপ্তানি খাত অচল হয়ে পড়বে এবং অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে।
শনিবার প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঠানো ওই যৌথ চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ), বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইলস মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)।
চিঠিতে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো নির্বাচনের আগে দ্রুত এই সমস্যা নিরসন করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার তাগিদ দিয়েছে। তারা প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের প্রচেষ্টার প্রশংসা করে বলেছে, দেশজুড়ে সৃষ্ট গণতান্ত্রিক উৎসবের আমেজের প্রতি তারা পূর্ণ একাত্মতা প্রকাশ করেন।
তবে একই সঙ্গে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরে ‘একটি গভীর অচলাবস্থার’ সৃষ্টি হয়েছে। ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’ কর্তৃক লাগাতার ধর্মঘট ও বহির্নোঙরে কার্যক্রম বন্ধের ডাক শিল্প ও বাণিজ্যে গভীর শঙ্কার সৃষ্টি করেছে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো তাদের চিঠিতে বন্দর অচল থাকার সম্ভাব্য কয়েকটি বিশাল ক্ষতির দিক তুলে ধরে:
১. রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত: দেশের ৯৯ শতাংশ কনটেইনার এবং ৭৮ শতাংশ সমুদ্রপথের বাণিজ্য এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হলে তৈরি পোশাকসহ সকল প্রধান রপ্তানি খাত অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
২. বাজারে কৃত্রিম সংকট: সামনে রমজান মাস থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালবাহী জাহাজ খালাস না হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে। এতে দ্রব্যমূল্য বেড়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে।
৩. ডেমারেজ চার্জের বিশাল বোঝা: বন্দরে জাহাজ জট ও কার্যক্রম স্থগিতের ফলে প্রতিদিন আমদানিকারকদের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ‘ডেমারেজ চার্জ’ (বিলম্ব ভাড়া) হিসেবে পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বিশাল বোঝা।
‘নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) পরিচালনার ভার আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল’ সহ চার দফা দাবিতে রোববার সকাল ৮টা থেকে ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’ লাগাতার ধর্মঘট শুরু করেছে।
ধর্মঘট শুরুর পর থেকে বন্দরের বিভিন্ন জেটিতে সব ধরনের পণ্য ও কনটেইনার ওঠানামা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, পণ্য ডেলিভারির কাজও থমকে গেছে। বন্দরের ভেতরে কোনো ট্রেলার বা পণ্যবাহী যান প্রবেশ করেনি। আন্দোলনকারী নেতারা বলছেন, বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন জেটিতে অন্তত ১২টি জাহাজ আটকা পড়েছে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বন্দর ও আশপাশের এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং সংগ্রাম পরিষদের দুজন সদস্যকে তুলে নেওয়া হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে: আন্দোলনরত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল করা, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া এবং চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহার করা।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো তাদের চিঠিতে বলেছে, এনসিটি ইজারা সংক্রান্ত বিরোধ বর্তমানে কর্মচারী ও বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি সাংঘর্ষিক অবস্থায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও তদন্তের উদ্যোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তাই তারা প্রধান উপদেষ্টার কাছে আহ্বান জানিয়েছে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তার সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধান দেওয়া হোক। তারা মনে করে, নির্বাচনের এই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে শিল্প, বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে আন্দোলনকারী ও বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সকল পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
