বিটকয়েনের দামের দ্রুত ওঠানামা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নতুন ঘোষণাগুলো মিলিয়ে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে ক্রিপ্টোকারেন্সি। তবে ব্লকচেইন, ইটিএফ, মিম কয়েন বা স্টেবলকয়েন—এসব শব্দ এখনো সাধারণ মানুষের কাছে বেশ জটিল মনে হয়। তাই ডিজিটাল অর্থনীতির এই আলোচিত জগতটিকে সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করা যাক।
বিটকয়েন
ক্রিপ্টোকারেন্সির মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নাম বিটকয়েন। এটি এক ধরনের ডিজিটাল মুদ্রা, যা কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। অর্থাৎ এটি সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থা। এই কারণেই আর্থিক স্বাধীনতা চান এমন মানুষের কাছে বিটকয়েন জনপ্রিয়।
তবে এর দাম খুবই অস্থিতিশীল। বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার আচরণের ওপর নির্ভর করে বিটকয়েনের দাম হঠাৎ বাড়তে বা কমতে পারে। কখনো আকাশছোঁয়া দাম, আবার কখনো বড় ধরনের পতন—এটাই বিটকয়েনের স্বভাব।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিটকয়েনের দাম প্রথমবারের মতো ১ লাখ ডলার স্পর্শ করে। এরপর ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তা আরও বেড়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ডলারে পৌঁছায়। কিন্তু পরবর্তীতে দাম দ্রুত কমে ৭০ হাজার ডলারের নিচে নেমে যায় এবং এক পর্যায়ে প্রায় ৬৭ হাজার ডলারে ঠেকে। ফলে আগের বাড়তি দাম অনেকটাই হারিয়ে যায়।
ব্লকচেইন
ব্লকচেইন হলো সেই প্রযুক্তি, যার ওপর ভিত্তি করে বিটকয়েনসহ সব ক্রিপ্টোকারেন্সি কাজ করে। সহজভাবে বললে, এটি একটি ডিজিটাল হিসাবের খাতা, যেখানে সব লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ করা হয়।
প্রতিটি লেনদেন আলাদা আলাদা ব্লকে রাখা হয় এবং এসব ব্লক একটির সঙ্গে আরেকটি যুক্ত হয়ে একটি চেইন তৈরি করে—এ কারণেই নাম ‘ব্লকচেইন’। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে থাকা কম্পিউটার নেটওয়ার্ক এসব লেনদেন যাচাই করে।
বিটকয়েন নেটওয়ার্কে এই যাচাই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘মাইনিং’। যারা প্রথমে লেনদেন যাচাই করতে পারে, তারা পুরস্কার হিসেবে বিটকয়েন পায়। তবে এ প্রক্রিয়ায় প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হওয়ায় এটি নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে।
ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ
ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ হলো এমন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, যেখানে মানুষ ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচা করতে পারে। এটি অনেকটা শেয়ার বাজারের ব্রোকারেজ হাউসের মতো কাজ করে।
এখানে ব্যবহারকারীরা ডলার বা অন্য মুদ্রা জমা দিয়ে বিটকয়েন বা ইথেরিয়ামের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সি কিনতে পারেন। সাধারণত প্রতিটি লেনদেনের জন্য এক্সচেঞ্জ ফি নেওয়া হয়।
ক্রিপ্টো ওয়ালেট
ক্রিপ্টোকারেন্সি রাখার জন্য ব্যবহৃত হয় ক্রিপ্টো ওয়ালেট। এটি মূলত ডিজিটাল সম্পদ সংরক্ষণের জায়গা।
দুই ধরনের ওয়ালেট রয়েছে—
- হট ওয়ালেট: ইন্টারনেট সংযুক্ত থাকে, ব্যবহার সহজ এবং দ্রুত লেনদেন করা যায়।
- কোল্ড ওয়ালেট: অফলাইন ডিভাইস, যেমন বিশেষ ইউএসবি। এটি বেশি নিরাপদ এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হয়।
ইথেরিয়াম
ইথেরিয়াম বলতে সাধারণত দুইটি বিষয় বোঝায়—একটি হলো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি, যার টোকেনের নাম ‘ইথার’। অন্যটি হলো এর ব্লকচেইন প্রযুক্তি, যার ওপর নানা ধরনের অ্যাপ, স্মার্ট কনট্রাক্ট ও এনএফটি তৈরি করা যায়।
২০২২ সালে ইথেরিয়াম নতুন একটি পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে রূপান্তরিত হয়, যার ফলে আগের তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ খরচ হয়।
ইটিএফ
ইটিএফ বা এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড হলো বিনিয়োগের একটি প্যাকেজ। এতে একসঙ্গে অনেক সম্পদে বিনিয়োগ করা যায়, যেমন সোনা, শেয়ার বা অন্য সম্পদ।
এটি শেয়ার বাজারে শেয়ারের মতো কেনাবেচা করা যায়। ইটিএফের দাম নির্ভর করে এর ভেতরে থাকা সম্পদের মোট মূল্যের ওপর।
স্পট বিটকয়েন ইটিএফ
স্পট বিটকয়েন ইটিএফ সরাসরি বিটকয়েন কিনে রাখে। ফলে বিটকয়েনের দাম বাড়লে বা কমলে ইটিএফের দামও একইভাবে ওঠানামা করে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো এ ধরনের স্পট বিটকয়েন ইটিএফ অনুমোদন দেওয়া হয়। এর ফলে বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো সহজেই শেয়ার বাজারের মাধ্যমে বিটকয়েনে বিনিয়োগ করতে পারছে।
মিম কয়েন
মিম কয়েন হলো এমন ক্রিপ্টোকারেন্সি, যা সাধারণত ইন্টারনেট ট্রেন্ড বা মজার ‘মিম’-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। এগুলোর দাম মূলত জনপ্রিয়তা ও অনুমানের ওপর নির্ভর করে।
তবে এগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সময় ‘রাগ পুল’ নামে প্রতারণার ঘটনা ঘটে, যেখানে প্রকল্পের উদ্যোক্তারা হঠাৎ করে লেনদেন বন্ধ করে বিনিয়োগকারীদের অর্থ নিয়ে উধাও হয়ে যায়।
স্টেবলকয়েন
স্টেবলকয়েনও এক ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি, তবে এর মূল লক্ষ্য দামের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। সাধারণত এগুলো কোনো বাস্তব সম্পদের সঙ্গে যুক্ত থাকে, যেমন মার্কিন ডলার।
এ কারণে অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সির তুলনায় স্টেবলকয়েনের দাম কম ওঠানামা করে। তবে কিছু স্টেবলকয়েনের আকস্মিক পতনের ঘটনা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজর কাড়েছে, ফলে এ খাতে এখন বাড়তি পর্যবেক্ষণ চলছে।
