ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন: নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি, প্রধান বিরোধী দলে জামায়াত

দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতার বাইরে থাকার অবসান ঘটিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনের মধ্যে ১৫১টি আসনে জয় পেয়েছে দলটি।

এবারের নির্বাচনে ছিল না গত ৩৫ বছর ধরে দেশের রাজনীতির প্রধান মেরুতে থাকা আওয়ামী লীগ। অন্তর্বর্তী সরকারের নিষেধাজ্ঞা ও নিবন্ধন স্থগিত থাকায় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়নি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে শাসন করা দলটি।

প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। জুলাই অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত ধর্মভিত্তিক দলটি পেয়েছে ৪২টি আসন। এর আগে বাংলাদেশের কোনো নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১৮টি আসন পেয়েছিল জামায়াত।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক বিজেপি ও গণসংহতি আন্দোলন একটি করে আসন পেয়েছে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক এনসিপি তিনটি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসন পেয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন চারটি আসনে। এখনো ৯৪টি আসনের ফল ঘোষণা বাকি থাকলেও সেখানেও এগিয়ে আছেন বিএনপির প্রার্থীরা।

একই দিনে সংস্কার প্রশ্নে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে। এর মাধ্যমে জুলাই সনদের অন্তর্ভুক্ত সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮ দফা বাস্তবায়নের সম্মতি দিয়েছেন দেশের নাগরিকরা। যদিও গণভোটের প্রক্রিয়া ও প্রশ্নের গঠন নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রত্যাবর্তন

১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনবার সরকার গঠন করেছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। এবার তাদেরই সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বে চতুর্থবারের মতো দেশ শাসনের ভার নিতে যাচ্ছে দলটি।

লন্ডনে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে বিপুল সংবর্ধনায় দেশে ফিরে নির্বাচনি যাত্রায় নেমেছিলেন তারেক রহমান। মায়ের মৃত্যুর পর দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তিনি। দেশে ফেরার পাঁচ দিনের মাথায় মারা যান খালেদা জিয়া। নির্বাচনি আমেজের মধ্যেই মায়ের বিদায়ে দলের নেতৃত্ব দেন তারেক।

ভোটের সকালে বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে বিএনপির জয়ের ব্যাপারে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আন্দোলনের সময়কার সঙ্গীদের পাশাপাশি ‘কম-বেশি’ আরও রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে দেশ পরিচালনা করতে চান তারা।

এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে তিন দশক পর সরকারপ্রধানের পদে নতুন কোনো মুখ পাচ্ছে বাংলাদেশ। ১৯৯১ সালের পর এটি তৃতীয় বার, যখন খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা কেউই সরকারপ্রধানের লড়াইয়ে নেই।

প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে জামায়াত

ভোটের লড়াইয়ে তারেক রহমানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার কথা বলে এতদিন রাজনীতি করে আসা জামায়াতকে ভোটের প্রচারে নতুন রূপে দেখানোর চেষ্টা করেন তিনি।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রমের দল এলডিপির পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকা তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিকে সঙ্গী হিসেবে পাশে টেনে নেয় জামায়াত। প্রার্থী করা হয় একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বীকেও।

ক্ষমতায় গেলে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা জামায়াত বললেও ভোটের প্রচারে নারীদের নিয়ে জামায়াত আমিরসহ কয়েক নেতার বক্তব্যে বিতর্ক তৈরি হয়। শফিকুর রহমান বিএনপির অতীত মনে করিয়ে দিয়ে ‘দুর্নীতি ও চাঁদাবাজদের’ বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারে ঠাঁই পেয়েছিলেন জামায়াতের দুই নেতা। কিন্তু নিজেদের সক্ষমতায় সরকার গঠন তো দূরে থাকা, প্রধান বিরোধী দলের আসনেও বসার সুযোগ তাদের হয়নি। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর বদলে যাওয়া বাংলাদেশে এবার তারা সে সুযোগ পেতে যাচ্ছে।

শান্তিপূর্ণ ভোট, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছর পর অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে মোটাদাগে শান্তিপূর্ণভাবেই ভোটগ্রহণ চলে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া কোথাও বড় ধরনের গোলযোগের খবর পাওয়া যায়নি। কোনো কেন্দ্র বাতিল বা স্থগিত করতে হয়নি।

ভোট চলাকালে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, মানিকগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও গাইবান্ধায় ছয়জনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে পাঁচজন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান। একজনকে ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট তিনটি আসনের কয়েকটি কেন্দ্রে ‘ভোটগ্রহণে বিশৃঙ্খলার’ অভিযোগ তোলে। এনসিপি বলে, দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ ‘সন্তোষজনক’ হলেও তারপর থেকে সারা দেশ থেকে তারা বিভিন্ন অভিযোগ পেয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও ভোটের সময় বিভিন্ন স্থানে অনিয়মের অভিযোগ আনে।

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন জানায়, আশঙ্কাজনক কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, কোনো কেন্দ্রের ভোট স্থগিতও হয়নি। উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটে অংশগ্রহণ করায় দেশবাসীকে ধন্যবাদ দেয় তারা।

দুপুর ২টা পর্যন্ত সাড়ে ছয় ঘণ্টায় ৩৬ হাজার ৩১টি কেন্দ্রে ৪৭ দশমিক ৯১ শতাংশ ভোট পড়ার তথ্য দেয় নির্বাচন কমিশন। ৪২ হাজার ৬৫১টি কেন্দ্রে পুরো নয় ঘণ্টায় কত শতাংশ ভোট পড়েছে, সে তথ্য এখনো দেওয়া হয়নি।

প্রধান উপদেষ্টার অভিনন্দন ও সংযমের আহ্বান

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ‘শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হওয়ায়’ জাতিকে অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানান প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। একইসঙ্গে ফল ঘোষণার পরও রাজনৈতিক দলগুলোর সংযম অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।

ভোটগ্রহণ শেষে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক দলসমূহের দায়িত্বশীল আচরণ, প্রার্থীদের সংযম ও নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব—এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাই প্রমাণ করেছে যে, গণতন্ত্রের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার অটুট। জনগণ তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।”

প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, প্রশাসন, পর্যবেক্ষক দল, গণমাধ্যমকর্মী ও ভোটগ্রহণে সম্পৃক্ত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আজ আবারও প্রমাণ করেছে, জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। আমরা সম্মিলিতভাবে একটি জবাবদিহিমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে এগিয়ে যাব। এই নির্বাচন আমাদের জন্য মহা আনন্দের ও উৎসবের। এর মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের এক অভূতপূর্ব যাত্রা শুরু হলো।”

নোবেলজয়ী ইউনূস বিদায় বেলায় বলেন, “এই নির্বাচন দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর ছিল। এই ধারা ধরে রাখা সম্ভব হলে আমাদের গণতন্ত্র উৎকর্ষের শিখরে যাবে। আসুন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার এই অভিযাত্রায় আমরা একসঙ্গে কাজ করি।”

ফল ঘোষণা নিয়ে জামায়াতের অভিযোগ

বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১২টার দিকে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, বেশ কিছু আসনে রিটার্নিং অফিসাররা ফল ঘোষণা না করে ‘ঝুলিয়ে’ রেখেছেন। বিস্তারিত এখনই বলতে চাননি তিনি।

তিনি বলেন, “বেশকিছু আসনে আমাদের জানামতে আমরা এগিয়ে আছি। গণনাও কমপ্লিট। কিন্তু রিটার্নিং অফিসাররা ফল ঘোষণা করছেন না। ঝুলিয়ে রেখেছেন, আমরা বুঝছি না কেন। মাঝখানে আবার ওয়েবসাইটে দিয়ে উধাও করে দেওয়া হল।”

রাতে ঢাকা-৮ আসনে ফল পাল্টে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে যান জামায়াত জোটের শরিক এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। পরে পাল্টা অভিযোগ নিয়ে সেখানে যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস।

ফল ঘোষণা বাকি থাকলেও প্রাপ্ত আসন ও এগিয়ে থাকা প্রার্থীদের অবস্থান বিবেচনায় বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করা প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আওয়ামী লীগহীন এই নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘ দুই দশকের শাসন ফেরার অপেক্ষা প্রায় শেষের পথে।