দীর্ঘ ১৮ মাস দায়িত্ব পালন শেষে জাতির উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণ দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাত ৯টা ১৫ মিনিটে শুরু হওয়া এই ভাষণ বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। ভাষণে তিনি গণতন্ত্র, সংস্কার ও জবাবদিহিতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
ভাষণের শুরুতে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি দীর্ঘ ১৭ বছর পর অনুষ্ঠিত উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় জনগণ, রাজনৈতিক দল, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, এই নির্বাচন ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এবং দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
সংকটের সময় দায়িত্ব গ্রহণ
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের সময়ে তাকে দায়িত্ব গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছিল। সে সময় দেশের সামনে তিনটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়—সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার এই তিন অঙ্গীকার পূরণে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করেছে।
তার ভাষায়, অবাধ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনই ছিল এই সময়ের সবচেয়ে বড় অর্জন, যার মাধ্যমে জনগণ আবার তাদের ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে।
সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন
ভাষণে তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন করেছে এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে, যার বড় অংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে নাগরিক অধিকার সংহত করা, বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ধাপে ধাপে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা হয়েছে এবং পুলিশকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক বাহিনীতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
বিচার প্রক্রিয়া ও জুলাই সনদ
তিনি বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও গুমের ঘটনায় বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং একাধিক মামলার রায় ইতোমধ্যে ঘোষণা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে তিনি “জুলাই সনদ”-এর কথা উল্লেখ করেন। গণভোটে বিপুল সমর্থনের মাধ্যমে এই সনদ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তকে তিনি দেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
অর্থনীতি ও প্রবাসীদের ভূমিকা
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের অর্থনীতি ছিল বিপর্যস্ত। ব্যাংকিং খাতের সংকট, অর্থপাচার ও বৈদেশিক ঋণের চাপ ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি জানান, কাঠামোগত সংস্কার এবং প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবাহের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৩৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরবরাহ বৃদ্ধি, বাজার তদারকি ও মজুতদারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
কূটনীতি ও বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত
ভাষণে তিনি বলেন, নতুন পররাষ্ট্রনীতিতে সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ফলে শুল্কহার কমেছে এবং পোশাক শিল্পে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি জাপান ও চীনের সঙ্গে কৌশলগত অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সম্ভাবনার বাংলাদেশ
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ এখন কেবল সংকট থেকে উত্তরণের গল্প নয়, বরং অমিত সম্ভাবনার দেশ। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষা ও সততার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, এই তিন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, অতীতের দুর্নীতি, অনিয়ম ও জালিয়াতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার পথেই এগোতে হবে।
গণতন্ত্র রক্ষায় ঐক্যের আহ্বান
বিদায়ী ভাষণে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব শেষ করলেও গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও বাকস্বাধীনতার যে ধারা শুরু হয়েছে, তা যেন কোনোভাবেই থেমে না যায়। নতুন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব সবার—এই বার্তা দিয়ে তিনি দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানান।
গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের স্মরণ করে তিনি বলেন, তাদের আত্মত্যাগ যেন জাতি কোনোদিন ভুলে না যায় এবং প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে সেই স্মৃতি যেন পথ দেখায়।
বিদায়ের আগে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে তিনি ভাষণ শেষ করেন।
