তিস্তায় হচ্ছে আরেকটি ব্যারেজ, মহাসড়কে এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড, রেলে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন

  • প্রধানমন্ত্রী সংসদে জানালেন ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’-এর রূপরেখা
  • কৃষক কার্ড, ঋণ মওকুফ, খাল পুনঃখনন—চলছে নানা উদ্যোগ

জাতীয় সংসদে আজ ঐতিহাসিক এক অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বহুল আলোচিত ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ কর্মসূচির আওতায় কৃষি, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণমূলক নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছেন। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে নেওয়া পদক্ষেপগুলোর পাশাপাশি তিনি তিস্তায় নতুন ব্যারেজ নির্মাণ, মহাসড়কে এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড ও রেলপথে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন প্রবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন।

বুধবার (১৭ জুন) ত্রয়োদশ সংসদের দ্বিতীয় (বাজেট) অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রী এসব ঘোষণা দেন। সকালে মৌলভীবাজারে সরকারি সফরে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে রাতেই সংসদে যোগ দেন তিনি।

কৃষি খাতে অভূতপূর্ব বিপ্লবের পরিকল্পনা

সিরাজগঞ্জ-১ আসনের এমপি মো. সেলিম রেজার লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান কৃষি-বান্ধব সরকারের মূল লক্ষ্য হলো একটি আত্মনির্ভর, জলবায়ু-সহিষ্ণু, প্রযুক্তিনির্ভর ও কৃষক-কেন্দ্রিক আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। উৎপাদন ও বিপণন হবে সম্পূর্ণ তথ্যচালিত, প্রান্তিক কৃষক হবেন ক্ষমতায়িত উদ্যোক্তা।”

তিনি জানান, ইতিমধ্যে ১৪ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রি-পাইলটিং পর্যায়ে ৮টি বিভাগের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলায় এখন পর্যন্ত ২০ হাজার ৮৩২টি কৃষক কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্যখাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে। এ জন্য ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যা থেকে প্রায় ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ কৃষক উপকৃত হবেন।

এছাড়া দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন/পুনঃখনন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সার সুলভ মূল্যে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানো হচ্ছে। বিএডিসির মাধ্যমে উচ্চফলনশীল ও জলবায়ু সহনশীল বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। স্মার্ট কৃষি, প্রিসিশন এগ্রিকালচার, সেন্সর, এআই, আইওটি ও ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

তিস্তায় দ্বিতীয় ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এমপি আখতার হোসেনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি সংরক্ষণে আরেকটি ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে কারিগরি ও আর্থিক দিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

তিনি বলেন, ইতিমধ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনার আওতায় ১১০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ, ১১০ কিলোমিটার ড্রেজিং, ২২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, ৬৭টি গ্রোয়েন/স্পার নির্মাণ ও ১৭০ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সড়ক ও রেল যোগাযোগের আধুনিকায়ন

কুমিল্লা-১০ আসনের এমপি মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে জাতীয় মহাসড়কে এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড স্থাপন ও মাল্টিমোডাল পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। ওভারলোড নিয়ন্ত্রণে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ ও স্মার্ট মনিটরিং ব্যবস্থা চালু হবে। ঢাকার ওপর চাপ কমাতে রিং রোড ও রেডিয়াল নেটওয়ার্ক তৈরি করা হবে।

রেল খাতে তিনি জানান, প্রধান রুটগুলোতে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রেলওয়ে সেবা প্রতিটি জেলা ও প্রধান শহরে পৌঁছানো হবে। আন্তনগর ও কমিউটার ট্রেনের সংখ্যা ধাপে ধাপে বাড়ানোর প্রকল্প নেওয়া হবে।

হজের খরচ কমানোর উদ্যোগ

গাজীপুর-৪ আসনের এমপি সালাহ উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামীতে হজের খরচ কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৫ সালে সর্বনিম্ন প্যাকেজ ছিল ৪ লাখ ৭৮ হাজার ২৪২ টাকা, যা ২০২৬ সালে ১১ হাজার ৭৫ টাকা কমানো হয়েছে। ২০২৭ সালের প্যাকেজ যৌক্তিকভাবে নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।

পাবনা মানসিক হাসপাতাল আন্তর্জাতিক মানে

দিনাজপুর-১ আসনের এমপি মনজুরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির আওতায় পাবনা মানসিক হাসপাতালকে আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তর করে পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

হামের প্রাদুর্ভাব রোধে কঠোর পদক্ষেপ

জামালপুর-৩ আসনের এমপি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, হামের প্রাদুর্ভাব রোধে ইপিআই কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে। টিকা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণে কঠোর বিধি অনুসরণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে টিকা মজুত ব্যবস্থাপনা জোরদার, রোগ নজরদারি সম্প্রসারণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংসদ সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর এসব ঘোষণা জাতীয় উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করছেন সংসদ সদস্যরা।