পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের লক্ষ্য, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের আহ্বান

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমাতে আগামী পাঁচ বছরে দেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস ও সৌরচালিত সেচব্যবস্থাকে লাভজনক খাতে পরিণত করতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) ও সাধারণ মানুষকে বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

সোমবার (২০ জুলাই) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এনডিপি আয়োজিত ‘ভয়েস অব ডেভেলপমেন্ট: ব্রিজিং ডায়ালগস, পলিসিজ অ্যান্ড পার্টনারশিপস ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক জাতীয় কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমবে এবং সাশ্রয় হওয়া অর্থ দেশের অন্যান্য উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা সম্ভব হবে। তিনি জানান, বর্তমানে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৬২৯ মেগাওয়াট, যার মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসছে প্রায় ১ হাজার ৩৩৫ মেগাওয়াট। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ৯৯৭ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট স্থাপিত সক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট। ৫ কোটি ৩৯ লাখ গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে গত ২০ মে সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে।

গ্রামীণ এলাকায় সৌরবিদ্যুতের বিস্তারে এনজিওগুলোর সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্বারোপ করে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, গ্রামের বাড়ির ছাদে গুচ্ছভিত্তিক সৌরপ্যানেল স্থাপন করে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিক্রি করা যেতে পারে। এতে একদিকে বিদ্যুতের কভারেজ বাড়বে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরাও আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব। ফলে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাসভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়নের বড় কোনো সংকট হবে না।

কৃষি খাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, গভীর নলকূপের মতো সৌরচালিত সেচপাম্পও একটি লাভজনক ব্যবসায়িক মডেল হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহারের উদাহরণ তুলে ধরে জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ ছোট সৌরপ্যানেল ও পুনর্ব্যবহৃত ব্যাটারি ব্যবহার করে ইজিবাইক চালাচ্ছেন।

বায়োগ্যাসের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গবাদিপশুর গোবর থেকে উৎপাদিত বায়োগ্যাস ব্যবহার করে অনেকেই নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে আশপাশের পরিবারগুলোকেও রান্নার গ্যাস সরবরাহ করছেন। এ ধরনের উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানিনির্ভর দেশগুলো বাড়তি চাপের মুখে পড়ছে। সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর মাত্র দুই মাসে পেট্রোলিয়ামসহ বিভিন্ন জ্বালানি আমদানিতে প্রায় ২০০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে।

এছাড়া দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাহিদা পূরণে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সমুদ্রসম্পদের সম্ভাবনার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন আগে সমুদ্রসীমা অর্জন হলেও এখনো সেখানকার সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। তবে সরকার ইতোমধ্যে সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র আহ্বান করেছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সরকার সৌরপ্যানেল ও ব্যাটারিতে কর ও শুল্ক সুবিধা দিচ্ছে উল্লেখ করে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তাদের ব্যবসাভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত এনজিও প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করলে, বিদ্যুৎমন্ত্রী তাদের সেই বার্তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেন।