আরও দুই সপ্তাহ থাকতে পারে গ্যাস সংকট

মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) অগ্নিকাণ্ডের পাঁচ দিন পরও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল হতে আরও ৭ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এতে আবাসিক, শিল্প, সিএনজি ও বিদ্যুৎ খাতে চলমান গ্যাস সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গত মঙ্গলবার মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগে। দুর্ঘটনার পর একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কমে গেছে। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কমে গেছে এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানি করা গ্যাসের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট। একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমেছে। ফলে মোট সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে।

অন্যদিকে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। চাহিদার তুলনায় আগে থেকেই ঘাটতি থাকলেও টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর সংকট আরও বেড়েছে।

কবে স্বাভাবিক হবে সরবরাহ

সূত্র জানায়, আগুনে টার্মিনালের বয়লারের ক্যাবলসহ গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব মেরামতের জন্য যুক্তরাজ্য থেকে তিনজন প্রকৌশলী আনা হয়েছে। তারা ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন ও মেরামতের কাজ করছেন।

সরকার দ্রুত টার্মিনাল চালুর জন্য এক্সিলারেট এনার্জিকে নির্দেশ দিলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেনি। আগামী ৫ থেকে ৮ দিনের মধ্যে আংশিকভাবে চালু করা সম্ভব হলে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যেতে পারে। তবে পুরো সক্ষমতায় ফিরতে ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) রফিকুল ইসলাম বলেন, শর্ট সার্কিটের কারণে ক্যাবল পুড়ে গেছে। বিদেশি প্রকৌশলীরা মেরামতের কাজ করছেন। কাজ শেষ হওয়ার নির্দিষ্ট সময় এখনই বলা যাচ্ছে না।

জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, দ্রুত চালুর জন্য এক্সিলারেট এনার্জিকে বলা হয়েছে। কিছু যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আনতে হতে পারে।

বাসাবাড়িতে রান্নার সংকট

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকেরা। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা ও বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাস থাকছে না।

অনেক এলাকায় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকছে যে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার বৈদ্যুতিক চুলা ও ইন্ডাকশন কুকার ব্যবহার করছে। কেউ কেউ গভীর রাতে গ্যাসের চাপ বাড়লে পরদিনের রান্না করে রাখছেন।

সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন

গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও তীব্র ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলার স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কম থাকায় দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে কার্যক্রম।

খোলা থাকা স্টেশনগুলোতে মধ্যরাত থেকেই যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। অনেক চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও গ্যাস না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, একটি স্টেশন স্বাভাবিকভাবে চালাতে অন্তত ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন। কিন্তু অনেক এলাকায় বর্তমানে ৪ থেকে ৫ পিএসআই, কোথাও ২ পিএসআইয়েরও কম চাপ পাওয়া যাচ্ছে।

শিল্প উৎপাদনে প্রভাব

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতেও। অনেক কারখানায় উৎপাদন কমিয়ে আনতে হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প হিসেবে ডিজেল ও এলপিজি ব্যবহার করছে, এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

শিল্প উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, সংকট দীর্ঘায়িত হলে রপ্তানি পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহে সমস্যা তৈরি হতে পারে।

তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, তিতাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট। টার্মিনাল দুর্ঘটনার আগে যেখানে প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল, বর্তমানে তা কমে প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে।

বাড়তে পারে লোডশেডিং

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক দিন বৃষ্টি ও কম চাহিদার কারণে বড় ধরনের লোডশেডিং হয়নি। তবে আগামী দিনে তাপমাত্রা বাড়লে এবং শিল্পকারখানা স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরলে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে। তখন লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শনিবার বিকেল ৫টায় দেশে লোডশেডিং ছিল ৮২১ মেগাওয়াট। ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৪৩১ মেগাওয়াট।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যা দুর্ঘটনার আগে ছিল প্রায় ৯০ কোটি ঘনফুট। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে প্রায় চার হাজার মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানি উৎস তৈরি করা জরুরি।