মিরাজ শেখ গুমের অভিযোগে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চায় আসক

বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার জয়মনির ঘোল এলাকার বাসিন্দা মিরাজ শেখকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধানের ভিত্তিতে সংগঠনটি বলছে, ঘটনাটি গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে এবং এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

মিরাজ শেখ (৩০) সুন্দরবনে মাছ ধরার পাশাপাশি ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালাতেন। গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় কোস্টগার্ড সদস্য পরিচয়ে আসা কয়েকজন ব্যক্তি তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

ঘটনাটি নিয়ে হাইকোর্ট ইতোমধ্যে মিরাজ শেখকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচও অভিযোগটির বিষয়ে তদন্ত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

আসক জানায়, গত ১৬ ও ১৭ মে সংগঠনটির প্রতিনিধিদল সরেজমিনে গিয়ে মিরাজের পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় সাংবাদিক, পুলিশ এবং কোস্টগার্ড কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করে।

তথ্যানুসন্ধানে উঠে এসেছে, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় জয়মনির ঘোল এলাকার একটি চায়ের দোকানের সামনে থেকে সাদাপোশাকে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি মিরাজকে ধরে নিয়ে যান। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে তাকে একটি কোস্টগার্ডের স্পিডবোটে তোলা হয়, যেখানে ইউনিফর্ম পরিহিত আরও কয়েকজন সদস্য অবস্থান করছিলেন।

মিরাজের স্ত্রী দাবি করেন, স্বামীকে তুলে নেওয়ার পর তিনি হারবারিয়া কোস্টগার্ড স্টেশনের পন্টুনে গিয়ে তাকে সদস্যদের হেফাজতে দেখতে পান। পরে স্পিডবোটে করে তাকে অন্যত্র নিয়ে যেতে দেখেন বলেও জানান তিনি।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, ঘটনার রাতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে কোস্টগার্ড স্টেশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মিরাজকে নেওয়া হয়েছে এবং পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে পরদিন কোস্টগার্ড কার্যালয়ে গেলে প্রথমে তাকে আটক করার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়। পরে এক সদস্য জানান, মিরাজকে নিয়ে অভিযানে যাওয়া হয়েছে এবং বিকেলে এলে দেখা করা যেতে পারে।

আসকের তথ্যানুসন্ধানে আরও জানা যায়, মিরাজকে তুলে নেওয়ার সময় তার মোটরসাইকেল স্থানীয় এক চায়ের দোকানদারের জিম্মায় রেখে যাওয়া হয়েছিল। ঘটনার ৮ থেকে ১০ দিন পর গভীর রাতে কোস্টগার্ড সদস্য পরিচয়ে আসা মুখোশধারী দুজন ব্যক্তি মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে দিগরাজ কোস্টগার্ড বেজের লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন মিরাজ শেখকে আটক বা তুলে নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, জয়মনির ঘোল এলাকা অতীতে দুষ্কৃতকারীদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। কোস্টগার্ডের কার্যক্রমে অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করছে।

মিরাজের পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর একাধিকবার থানায় গেলেও পুলিশ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নিতে অনীহা দেখায়। পরে ২৩ এপ্রিল একটি জিডি নথিভুক্ত হলেও সেখানে কোস্টগার্ডের নাম উল্লেখ করতে দেওয়া হয়নি। পরিবারের দাবি, পুলিশের নির্দেশনায় জিডিতে শুধু উল্লেখ করা হয় যে মিরাজ নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছেন।

আসক তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, প্রাপ্ত তথ্য, পরিবারের বক্তব্য এবং একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনার সঙ্গে কোস্টগার্ডের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট অসংগতি রয়েছে। এ পরিস্থিতি একটি গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগের বিষয়।

সংগঠনটি বলেছে, কোনো ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নেওয়ার পর তার অবস্থান অস্বীকার করা, পরিবারকে তথ্য না দেওয়া কিংবা আইনানুগ সময়ের মধ্যে আদালতে উপস্থাপন না করা সংবিধানে নিশ্চিত জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের অধিকারের পরিপন্থী। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও জোরপূর্বক গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

আসক মনে করে, রাষ্ট্রীয় কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উঠলে তা শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়; বরং আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং জনআস্থার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

এ অবস্থায় সংগঠনটি অবিলম্বে মিরাজ শেখের অবস্থান নির্ণয়, পরিবারের কাছে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ, বিচার বিভাগীয় তদন্ত পরিচালনা এবং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।