বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের সোনালি যুগের অন্যতম নির্মাতা, বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সাবেক মহাপরিচালক এবং প্রখ্যাত প্রযোজক মুস্তাফিজুর রহমানকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। দেশের বাইরে অবস্থানরত দুই ছেলে দেশে ফেরার পর বুধবার (২৯ জুলাই) একাধিক জানাজা শেষে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ছোট ছেলে রাজিন অভি মুস্তাফিজ অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে এবং বড় ছেলে তানভীর রানা মুস্তাফিজ কানাডার টরন্টো থেকে দেশে ফেরার পর দাফনের আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। গত রোববার অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করার পর মরদেহ মহাখালীর একটি হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছিল।
বুধবার সকাল ১০টায় তার মরদেহ নেওয়া হয় দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবনে। সেখানে সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও গণমাধ্যমকর্মীরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বিটিভির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
পরে মরদেহ নেওয়া হয় চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে। সেখানে দ্বিতীয় জানাজায় অংশ নেন চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, বিটিভির সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং শিল্পীরা।
এরপর মরদেহ নেওয়া হয় উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টর জামে মসজিদে। বাদ জোহর তৃতীয় ও শেষ জানাজা শেষে বিকেলে ঢাকার বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
গত ২৬ জুলাই সন্ধ্যায় উত্তরার নিজ বাসায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মুস্তাফিজুর রহমান ছিলেন দেশের টেলিভিশন জগতের একজন দূরদর্শী নির্মাতা ও সংগঠক। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি পরবর্তীতে বাংলাভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং গাজী টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত থেকে দেশের বেসরকারি টেলিভিশন শিল্পের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তার প্রযোজনায় নির্মিত ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘সময় অসময়’, ‘পারলে না রুমকি’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় নাটক দর্শকমহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়। হুমায়ূন আহমেদের কালজয়ী ধারাবাহিক নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’কে ধারাবাহিক রূপ দেওয়ার পেছনেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে সহকর্মীরা উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক উপমহাপরিচালক ও লেখক খ ম হারূন বলেন, হুমায়ূন আহমেদের লেখা ‘এইসব দিনরাত্রি’ প্রথমে এক পর্বের নাটক হিসেবে পরিকল্পিত ছিল। পাণ্ডুলিপি পড়ে মুস্তাফিজুর রহমানই এটিকে ধারাবাহিক নাটক হিসেবে নির্মাণের পরামর্শ দেন। পরে নাটকটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং বাংলা নাটকের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে স্থান করে নেয়।
খ ম হারূন আরও বলেন, মুস্তাফিজুর রহমান টেলিভিশন মাধ্যমকে গভীরভাবে বুঝতেন এবং নতুন প্রজন্মের নির্মাতা ও কর্মীদের গড়ে তুলতে সবসময় কাজ করেছেন। তার দূরদর্শিতা ও সৃজনশীলতা দেশের টেলিভিশন নাটককে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘শঙ্খনীল কারাগার’-এর পরিচালক ও চিত্রনাট্যকারও ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। নাটক ও টেলিভিশন নির্মাণে তার অবদান দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মুস্তাফিজুর রহমান ১৯৪৩ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার দুই ছেলে বর্তমানে কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় কর্মরত রয়েছেন।
