‘ভারতের ভয়ে’ ফেলানীর ভাস্কর্য সরানো হয়েছে: নাহিদ ইসলাম

‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ থেকে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত ফেলানীর ভাস্কর্য এবং মোদিবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন স্মৃতি ও ছবি সরিয়ে ফেলার অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তাঁর দাবি, ভারতকে ভয় পাওয়ার কারণেই এসব ইতিহাস জাদুঘর থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে রাজধানীর গণভবনে স্থাপিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ অভিযোগ করেন। এ সময় নাহিদ ইসলামের সঙ্গে এনসিপির অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী ও সংসদ সদস্যরা ছিলেন।

জাদুঘরের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন নাহিদ। পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, জাদুঘরের আগের পরিকল্পনার সঙ্গে বর্তমান প্রদর্শনীর বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, জাদুঘরে আগে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি আলাদা অংশ ছিল। সেখানে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে নিহত বাংলাদেশিদের তালিকা এবং ফেলানীর একটি ভাস্কর্যও রাখা হয়েছিল। বর্তমানে এসবের কোনোটি দেখা যাচ্ছে না। একইভাবে নরেন্দ্র মোদিবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন স্মৃতি ও ছবিও সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘বিশেষত, এখানে সীমান্ত হত্যার একটা সেগমেন্ট ছিল। আমাদের সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফের হাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার ভাইবোনদের একটা তালিকা ছিল, ফেলানীর একটা ভাস্কর্য ছিল। সেই জিনিসগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। মোদিবিরোধী আন্দোলনের কিছু স্মৃতি ও ছবি ছিল, সেটাও সরিয়ে ফেলা হয়েছে।’

এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভারতীয় আগ্রাসনের চিত্র এখানে নেই। বিএনপি হয়তো ভারতকে ভয় পাচ্ছে। যদি ভয় না পেত, তাহলে যেটা ইতিহাসের অংশ, সেটা কেন থাকবে না।’

জুলাই জাদুঘরের বর্তমান প্রদর্শনী নিয়ে নাহিদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাদুঘরের যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে বর্তমান সরকার সেখানে কিছু পরিবর্তন এনেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় জাদুঘরের কার্যক্রম পরিদর্শনের সময় তিনি নিজেও ছিলেন এবং বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসও উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বলেন, জাদুঘরের বর্তমান প্রদর্শনীতে বিএনপি একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে যে নির্যাতনের শিকার হয়েছে, সে-সংক্রান্ত বিষয়বস্তু তুলনামূলকভাবে বেশি জায়গা পেয়েছে। একই সঙ্গে দলীয় বক্তব্য ও বয়ানের উপস্থিতিও বেড়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জাদুঘরের বর্তমান চিত্রে দল হিসেবে বিএনপির নির্যাতনের কনটেন্ট বৃদ্ধি করা হয়েছে। দলীয় বক্তব্য ও বয়ান বেড়েছে। এই জাদুঘর সব সময় একটা একটা আপডেটের মধ্যে থাকবে।’

জাদুঘরের ব্যবস্থাপনা ও প্রদর্শনী নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে এনসিপির পক্ষ থেকে বিভিন্ন মতামত তুলে ধরা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ আরও বিস্তৃতভাবে উপস্থাপনের দাবি জানিয়ে নাহিদ বলেন, আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের ঘটনা সময়ক্রম অনুসারে তুলে ধরা প্রয়োজন। বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা, ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন জেলার শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ও আন্দোলনের ঘটনাগুলো আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখানো উচিত।

তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন এবং অনেক জায়গায় নির্যাতন ও নির্মমতার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এসব ঘটনার অনেক কিছুই বর্তমান প্রদর্শনীতে যথাযথভাবে উঠে আসেনি।

নাহিদের অভিযোগ, জাদুঘরে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু পরিচিত মুখকে বারবার তুলে ধরা হয়েছে। এর বাইরে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও বিভিন্ন অঞ্চলের আন্দোলনের ইতিহাস আরও সমানভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান করার পক্ষেও মত দেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস অতীতে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসও যেন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বয়ানে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলীয়করণ করা হয়েছিল। একদল এসেছে, পাঠ্যপুস্তক পাল্টে গিয়েছে, ইতিহাস পাল্টে গিয়েছে। আমরা চাই, জুলাই অভ্যুত্থান-সম্পর্কিত যেকোনো ইতিহাস, বক্তব্য ও জাদুঘরের যাতে একটা জাতীয় চরিত্র থাকে। প্রকৃত সত্যটাই যেন সেখানে আসে।’

তিনি আরও বলেন, জুলাই জাদুঘরে দর্শনার্থীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু বর্তমান অবকাঠামো ও জনবল দিয়ে এই বিপুল চাপ সামলানো কঠিন। জাদুঘরের কার্যক্রম পরিচালনায় পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

নাহিদের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এবং এর চেতনা ধারণ করেন এমন ব্যক্তিদের জাদুঘরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করা উচিত।

এ সময় এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন, সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন ও নুসরাত তাবাসসুম, কেন্দ্রীয় নেতা সারজিস আলম, সারোয়ার তুষার, এস এম সাইফ মোস্তাফিজ, মাহিন সরকার, জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম, জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান, সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার এবং চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক খান তালাত মাহমুদ রাফিসহ এনসিপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।