নিজস্ব প্রতিবেদক
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী জোটের প্রার্থী হিসেবে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্ট অলি আহমদের নাম ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। রোববার বেইলি রোডে বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবনে জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক শেষে তার নাম ঘোষণা করা হয়।
সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে অলি আহমদ
দুপুর ১টার দিকে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে জোটের নেতারা অলি আহমদকে সঙ্গে নিয়ে সাংবাদিকদের সামনে আসেন। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ও রাজনৈতিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে তারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। জোটের মধ্যে আলোচনা করে সর্বসম্মতভাবে অলি আহমদকে প্রার্থী করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
জয়-পরাজয়ের হিসাব জেনেও নির্বাচনে
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বর্তমান সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি প্রতিনিধিত্ব থাকায় তাদের মনোনীত প্রার্থীর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
এরপরও বিরোধী জোট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শনিবার সন্ধ্যায় জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরদিন সকালে বেইলি রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে বৈঠকে বসেন ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা।
অলি আহমদের নাম ঘোষণা নাহিদের
বৈঠক শেষে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের সামনে অলি আহমদের নাম ঘোষণা করেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রত্যাশা ছিল তাদের। কিন্তু সরকার সেই প্রক্রিয়ায় এগোয়নি এবং সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় অধিবেশনও ডাকেনি।
নাহিদের বক্তব্যের সময়ই জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানসহ জোটের অন্য নেতারা অলি আহমদকে সঙ্গে নিয়ে সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত হন।
‘সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে মনোনয়ন’
শফিকুর রহমান বলেন, তাদের বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি পদের জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
পরে বক্তব্য দিতে গিয়ে অলি আহমদ ১১ দলীয় জোটের নেতাদের পাশাপাশি দেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, জোটের নেতারা তাকে একজন মুক্তিযোদ্ধা ও পরীক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
অলি আহমদ আরও বলেন, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ নেই এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও কোনো প্রশ্ন নেই। তিনি জনগণের স্বার্থে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক অবস্থান থেকে তারা জাতির সঙ্গে কখনো বেঈমানি করবেন না। নির্বাচনে জয় বা পরাজয় বড় বিষয় নয়, জনগণের জন্য ভালো এবং দেশের স্বার্থে যা প্রয়োজন, সেটিই তারা করবেন।
অলি আহমদকে যোগ্য প্রার্থী বললেন মামুনুল
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকও অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য যোগ্য প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ হিসেবে অলি আহমদ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম।
সংবাদ সম্মেলন শেষে জোটের নেতাদের সঙ্গে করমর্দন করেন অলি আহমদ।
মুক্তিযুদ্ধ থেকে রাজনীতিতে
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতার জন্য ‘বীর বিক্রম’ খেতাব পাওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা অলি আহমদ ১৯৭৮ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। দীর্ঘ সময় দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। বিএনপি সরকারের আমলে দুই দফায় মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।
শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে ২০০৬ সালে বিএনপি ছাড়েন অলি আহমদ। একই বছরের ২৬ অক্টোবর এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্প ধারার সঙ্গে যৌথভাবে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) প্রতিষ্ঠা করেন।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক ও আদর্শগত মতপার্থক্যের কারণে ২০০৭ সালে বিকল্প ধারা ও এলডিপি আলাদা হয়ে যায়।
বিএনপির জোট থেকে জামায়াতের জোটে
রাজনৈতিক জীবনের এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সঙ্গে থাকলেও পরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হয় এলডিপি। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের মুখপাত্রের দায়িত্বও পালন করেন অলি আহমদ।
তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক মেরুকরণে বিএনপির সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এলডিপি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে যোগ দিলে বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়।
চট্টগ্রাম-১৪ আসনে পরিবারের প্রার্থী
চট্টগ্রাম-১৪ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে অলি আহমদের রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। বিএনপি ও এলডিপির হয়ে একাধিকবার এ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
এলডিপি ১১ দলীয় ঐক্যে যোগ দেওয়ার পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওই আসনে অলি আহমদের ছেলে ওমর ফারুককে প্রার্থী করা হয়। তবে ভোটের লড়াইয়ে বিএনপির প্রার্থী জসীম উদ্দীন আহমেদের কাছে পরাজিত হন তিনি।
আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিরোধী জোট অলি আহমদকে প্রার্থী করলেও সংসদে ক্ষমতাসীন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আগে থেকেই রাজনৈতিক মহলে ধারণা তৈরি হয়েছে।
