সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে গত ছয় মাসের বিভিন্ন কার্যক্রম ও অর্জনের চিত্র তুলে ধরেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। সরকারের এই সময়ের কর্মযজ্ঞকে ১০টি প্রধান ক্ষেত্রে ভাগ করে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো ও পরিবেশ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব বিষয় তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে তিনি জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থন ও আস্থাকে উল্লেখ করেন।
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে গুরুত্ব
মাহ্দী আমিন বলেন, সরকারের কার্যক্রমে বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংসদকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করার পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা, ধর্ম, বর্ণ ও মতের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকার গঠনের পর সংসদের প্রথম অধিবেশনেই শতাধিক অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সংসদ কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করার সুযোগ এবং বীরশ্রেষ্ঠদের নামে সংসদের গ্যালারির নামকরণও করা হয়েছে।
ইশতেহার বাস্তবায়নে বিভিন্ন উদ্যোগ
নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার দ্রুত কাজ শুরু করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র।
তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে প্রায় ১৩ লাখ কৃষক পরিবার উপকৃত হয়েছে।
এ ছাড়া কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও প্রবাসী কার্ড চালু, জেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান বিনিময় কেন্দ্র স্থাপন, ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী প্রদান এবং খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলা
দায়িত্ব নেওয়ার পর অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি করেন মাহ্দী আমিন।
রমজান মাসে বাজার নিয়ন্ত্রণ, ঈদে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিশ্চিত করা, কোরবানির পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং দ্রুত বর্জ্য অপসারণের বিষয়গুলো তিনি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহে চাপ তৈরি হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
বর্তমান গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুটি এফএসআরইউর একটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা কাটিয়ে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চীন ও মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের মাধ্যমেও গ্যাস সংকট মোকাবিলায় অগ্রগতি হয়েছে বলে তিনি জানান।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা
অবসরপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পাওনা পরিশোধের উদ্যোগকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়। প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার বকেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ২ হাজার কোটি টাকার চেক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে পর্যায়ক্রমে ১০০ থেকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, দুরারোগ্য রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়ে সহায়তা এবং দরিদ্র রোগীদের আর্থিক সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন বিষয় সংযোজন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াইফাই, প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ দেওয়া এবং মিড-ডে মিল চালুর উদ্যোগের কথাও জানানো হয়।
এ ছাড়া মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা, তৃতীয় ভাষা শিক্ষায় গুরুত্ব এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য আর্থিক সহায়তার বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
তরুণ ও উদ্যোক্তাদের জন্য উদ্যোগ
তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ, স্টার্টআপ ফান্ডিং, ইনোভেশন গ্র্যান্ট এবং ফ্রিল্যান্সার কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংযোগ বাড়ানো, তরুণদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর জন্য পৃথক তহবিল গঠনের কথাও তুলে ধরা হয়।
পাটকল ও চিনিকলসহ ঐতিহ্যবাহী বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ক্রমে চালুর উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর কার্যক্রম জোরদারের কথাও বলা হয়েছে।
আর্থিক খাতে সংস্কার
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আর্থিক খাতে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে দাবি করা হয়। ব্যবসা সহজ করা, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কর কমানো, আমানতকারীদের সুরক্ষা, বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং ব্যবসায়িক লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়া সহজ করার কথা জানানো হয়েছে।
দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে কাঁচামাল আমদানির ব্যয় কমানো এবং তৈরি পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করতে শুল্ক সমন্বয়ের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
জুলাই মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসা, মূল্যস্ফীতি কমে আসা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরাতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা ও প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ইপিজেড সম্প্রসারণ, বন্দরগুলো ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার উদ্যোগ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে সংস্কার কার্যক্রমের কথাও বলা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা ও বিচার
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং পুলিশ ও প্রশাসনকে জনবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মাহ্দী আমিন।
চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের তদন্তে অগ্রগতির কথা তুলে ধরা হয়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। পাশাপাশি মাদক, জুয়া, ধূমপান ও সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন ও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
অবকাঠামো ও পরিবেশ
ঢাকার যানজট কমাতে পরীক্ষামূলকভাবে এআইভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারীদের জন্য পিংক বাস সার্ভিস এবং ঢাকায় ২০০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ট্রেন ভাড়ায় ছাড়, বিশেষ সময়ে নারীদের জন্য আলাদা ট্রেন কামরা, তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের অগ্রগতির কথাও তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ-চীন ইকোনমিক করিডোর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সোলার প্রকল্প, বৃক্ষরোপণ ও খাল খনন কর্মসূচিকে টেকসই উন্নয়নের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কার্বন ক্রেডিটের সঙ্গে এসব উদ্যোগকে যুক্ত করার বিষয়ে কাজ চলছে বলে জানানো হয়।
মর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি
পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমতা, ন্যায্যতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করা হয়।
মালয়েশিয়া ও চীন সফরের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলা হয়, এসব সফরের মাধ্যমে বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও কৌশলগত সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের সভাপতিত্ব লাভকেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব
সরকারের ১৮০ দিনের কর্মযজ্ঞের সর্বশেষ দিক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের ধরনকে তুলে ধরা হয়েছে।
মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রচলিত ভিআইপি সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে যাচ্ছেন এবং বিভিন্ন জনসম্পৃক্ত কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নিচ্ছেন। খাল খনন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া, শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং মিতব্যয়ী জীবনযাপনের উদাহরণও তিনি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ১৬ বছরের শাসনামলের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জমে থাকা সমস্যার শতভাগ সমাধান ছয় মাসে সম্ভব নয়। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করছে।
সরকারের ক্ষমতার উৎস জনগণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণই সরকারের অনুপ্রেরণার উৎস এবং জনগণের কল্যাণকে সামনে রেখেই একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, মানবিক, নিরাপদ ও জনকল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে।
