সরকারি সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকদের কাছে কোথায়, কী পরিমাণ ঘুষ চাওয়া হচ্ছে, সেই অভিজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছে ‘ঘুষ.সাইট’ নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। নাম-পরিচয় প্রকাশ না করেই সেখানে ঘুষ চাওয়ার ঘটনা জানাতে পারছেন ভুক্তভোগীরা। চালুর প্রথম দুই দিনে ওয়েবসাইটটিতে জমা পড়েছে ৮০৪টি অভিযোগ। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে চাওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
‘ঘুষ.সাইট’ তৈরি করেছেন দুই বন্ধু সাইফ কবির ও শাহেদ শরিফ। বিদেশের একটি ওয়েবসাইটের ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁরা বাংলাদেশের জন্য এই প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করেন।
উদ্যোক্তাদের মূল লক্ষ্য হলো সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও সেবা নিয়ে নাগরিকদের ঘুষ চাওয়ার বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতাগুলো এক জায়গায় আনা। এর মাধ্যমে কোন দপ্তর বা সেবায় কত টাকার ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ বেশি রয়েছে, তার একটি সামগ্রিক চিত্র তৈরি করতে চান তাঁরা। তবে ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যকে কোনোভাবেই যাচাই করা অভিযোগ বা প্রমাণ হিসেবে দাবি করা হয়নি।
যেভাবে অভিযোগ জানানো যায়
ওয়েবসাইটে অভিযোগ দিতে ব্যবহারকারীকে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের নাম, সেবার ধরন, এলাকা, ঘুষ হিসেবে চাওয়া অর্থের পরিমাণ এবং ঘটনার শেষ পরিণতি জানাতে হয়। চাইলে ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণও দেওয়া যায়।
অভিযোগ জমা দিতে কোনো অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন নেই। পুরো প্রক্রিয়াটি দুই মিনিটেরও কম সময়ে সম্পন্ন করা যায়। তবে অভিযোগে কোনো ব্যক্তির নাম, পদবি কিংবা ফোন নম্বর দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি।
উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, নির্দিষ্ট কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে চিহ্নিত করা এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য নয়। বরং কোন সরকারি দপ্তর বা সেবা নিয়ে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ বেশি আসছে, সেটিই সামনে আনতে চান তাঁরা।
অভিযোগ জমা পড়ার পর তা সঙ্গে সঙ্গে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় না। প্রথমে মডারেশন করা হয়। এ সময় অভিযোগে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য সরিয়ে ফেলা হয়। পাশাপাশি আক্রমণাত্মক, অস্পষ্ট কিংবা ওয়েবসাইটের নীতিমালা লঙ্ঘন করে এমন অভিযোগ বাদ দেওয়া হয়।
মডারেশন শেষে প্রকাশিত অভিযোগগুলো বিভাগ, দপ্তর, সেবার ধরন, চাওয়া ঘুষের পরিমাণ এবং ঘটনার ফলাফল অনুযায়ী দেখা যায়।
দুই দিনে ৮০৪ অভিযোগ
উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২১ আগস্ট চালুর পর প্রথম দুই দিনে প্ল্যাটফর্মটিতে ৮০৪টি অভিযোগ জমা পড়ে। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে মোট ১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা চাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যে ঢাকা বিভাগ থেকে এসেছে সবচেয়ে বেশি ৪৩০টি অভিযোগ। চট্টগ্রাম থেকে ১৬৭টি, রাজশাহী থেকে ৪৪টি, খুলনা থেকে ৪৩টি, সিলেট থেকে ৩৮টি, রংপুর থেকে ৩৭টি, ময়মনসিংহ থেকে ৩০টি এবং বরিশাল থেকে ১৫টি অভিযোগ এসেছে।
অভিযোগকারীদের মধ্যে ১৮ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা ঘুষ দিতে রাজি হননি।
প্রকাশিত তথ্যকে প্রমাণ হিসেবে দেখছে না সাইটটি
‘ঘুষ.সাইট’-এর প্রকাশিত অভিযোগগুলোর প্রতিটিকে আলাদাভাবে সত্যতা যাচাই করা হয় না। তাই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিটি রিপোর্টের সঙ্গে ‘আনভেরিফায়েড’ উল্লেখ থাকে।
উদ্যোক্তারা স্পষ্ট করে বলেছেন, এই প্ল্যাটফর্ম কোনো অভিযোগকে সত্য ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে না এবং কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবেও এসব তথ্য উপস্থাপন করছে না।
এটি কোনো তদন্ত সংস্থা নয়। একইভাবে দুর্নীতি দমন কমিশনের বিকল্প হিসেবেও নিজেদের দাবি করছে না উদ্যোক্তারা। তাঁদের উদ্দেশ্য হলো নাগরিকদের অভিজ্ঞতাগুলো সংরক্ষণ করে সরকারি সেবায় ঘুষের অভিযোগের একটি উন্মুক্ত রেকর্ড তৈরি করা।
চলছে উদ্যোক্তাদের নিজস্ব অর্থে
এখন পর্যন্ত ‘ঘুষ.সাইট’ উদ্যোক্তাদের নিজস্ব অর্থেই পরিচালিত হচ্ছে। কোনো এনজিও বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত নয় প্ল্যাটফর্মটি। বাইরের কোনো অর্থায়নও নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন তাঁরা। তবে সাইটে স্বেচ্ছা অনুদানের সুযোগ রাখা হয়েছে।
উদ্যোক্তাদের একজন সাইফ কবির বলেন, এই উদ্যোগের সাফল্য শুধু ওয়েবসাইটে কত মানুষ প্রবেশ করলেন, তা দিয়ে তাঁরা বিচার করতে চান না।
তাঁর মতে, কোনো নাগরিক সরকারি সেবা নেওয়ার আগে যদি ওয়েবসাইটে অন্য মানুষের অভিজ্ঞতা দেখে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে ধারণা পান এবং অন্যায্য অর্থের দাবি প্রত্যাখ্যান করার সাহস পান, সেটিই হবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
