নেপালে ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধসে মৃত ৫৩৮, নিখোঁজ প্রায় হাজার

নেপালের হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি বেড়েই চলেছে। দেশটির তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় আকস্মিক বন্যার পর এখন পর্যন্ত ৫৩৮ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ বা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন রয়েছেন। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৯০ হাজারের বেশি মানুষ।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ৯৭৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তবে এই তালিকা এখনো চূড়ান্ত নয়। তালিকাভুক্ত কেউ নিরাপদে অন্য কোনো এলাকায় পৌঁছেছেন কি না, তা যাচাই করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ফেডারেশন জানিয়েছে, ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

বুধবার সকালে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছাকাছি রাসুয়া জেলার তিমুরে ও স্যাফ্রুবেশি এলাকায় ভোতেকোশি নদীতে হঠাৎ প্রবল বন্যা দেখা দেয়। পানির সঙ্গে কাদা, পাথর ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে নদীর তীরবর্তী জনপদে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এতে সড়ক, সেতু, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে বন্যার পানি ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে মেশে।

প্রবল স্রোতে মানুষ, যানবাহন ও স্থাপনা ভেসে যায়। এমনকি মরদেহ ও মানবদেহের বিভিন্ন অংশ বন্যাকবলিত মূল এলাকা থেকে অনেক দূরে ভাটির বিভিন্ন জেলায় গিয়ে পৌঁছেছে। রাসুয়া ছাড়াও নুয়াকোট, ধাদিং, গোরখা, তানাহুন, চিতওয়ান ও নাওয়ালপরাসি এলাকায় মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে।

উদ্ধার করা মরদেহের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে চিতওয়ান জেলায়। সেখানে ২২১ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। নবলপরাসী পূর্বে ১৩৪, গোর্খায় ৪৬, নুয়াকোটে ৩৭, ধাদিংয়ে ৩৩, তানাহুনে ২৮, নবলপরাসী পশ্চিমে ২৭ এবং রাসুয়ায় ১২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

জীবিত উদ্ধার হওয়া ৭৩ জন বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে রাসুয়ায় ৪৩, নুয়াকোটে ২৭ এবং ধাদিংয়ে তিনজন চিকিৎসা নিচ্ছেন।

নিখোঁজদের তালিকাতেও রয়েছে বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক। ৯৭৭ নিখোঁজ ব্যক্তির মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি। এছাড়া ১২৭ জন অনাবাসী নেপালি রয়েছেন। রাসুয়া জেলা জরুরি পরিচালনা কেন্দ্রের তালিকায় থাকা ১৬১ জন, মাকওয়ানপুরের তালিকাভুক্ত ৬৬ জন এবং নুয়াকোটের একজনও নিখোঁজ রয়েছেন।

সরকারি ও নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকা ১০৫ জনেরও কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে নেপালি সেনাবাহিনীর ৪৫, পুলিশের ২৮, কাস্টমস কার্যালয়ের ১৫, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ১৩ এবং অভিবাসন কার্যালয়ের চারজন রয়েছেন।

এদিকে নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, বন্যাকবলিত রাসুয়া থেকে ১১৭ জন বিদেশি পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮৫ জন ভারতীয়, ১৬ জন চীনা, নয়জন দক্ষিণ কোরীয়, দুজন মার্কিন ও দুজন ইতালীয় নাগরিক। আরও তিনজনের জাতীয়তা তখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযানে নেপালি সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন। মোট ১৪ হাজার ৮২৯ জন নিরাপত্তাকর্মীকে অভিযানে মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ৬ হাজার ৬৯৮, পুলিশের ৪ হাজার ৪৭৩ এবং সশস্ত্র পুলিশের ৩ হাজার ৬৫৮ জন সদস্য রয়েছেন।

হেলিকপ্টারে করে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৭৪২ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী ও বেসরকারি অপারেটরদের সমন্বয়ে এ কাজে ৭৮টি ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়েছে।

তবে উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি এখন নতুন সংকট তৈরি হয়েছে উদ্ধার করা মরদেহ সংরক্ষণ ও শনাক্ত করা নিয়ে। চিতওয়ানে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ১৮৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হলেও জেলার হাসপাতালগুলোর মর্গে একসঙ্গে মাত্র ৩০ থেকে ৫০টি মরদেহ রাখা সম্ভব। ফলে ভারতপুরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের একটি অব্যবহৃত ভবনকে অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণকেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছে। সেখানে প্রায় ২৫০টি মরদেহ রাখা যাবে।

নবলপরাসী পূর্ব জেলাতেও মরদেহ রাখার জায়গার সংকট দেখা দিয়েছে। সেখানে জায়গা না থাকায় কিছু মরদেহ পোখারা, বুটওয়াল, ভৈরহাওয়া ও পালপায় পাঠানো হয়েছে। কাওয়াসোটির একটি কমিউনিটি ফরেস্ট হলও অস্থায়ী মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যদিকে পোখারায় তানাহুন, গোর্খা, নাওয়ালপরাসি পূর্ব ও ধাদিং থেকে ৯৩টি মরদেহ নেওয়া হয়েছে।

কাসকি জেলার হাসপাতালগুলোর মর্গের সম্মিলিত ধারণক্ষমতা ৮৮টি হওয়ায় সেখানেও ধারণক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

মরদেহ শনাক্তের জন্য পুলিশ ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ সংগ্রহ ও ময়নাতদন্তের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ডিএনএ নমুনা নিচ্ছে। এসব নমুনা পরীক্ষার জন্য কাঠমান্ডুর নেপাল একাডেমি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং নেপাল পুলিশের কেন্দ্রীয় ফরেনসিক বিজ্ঞান গবেষণাগারে পাঠানো হচ্ছে।

যেসব মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হবে না, সেগুলো নির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী নিরাপদ স্থানে দাফনের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি মরদেহকে আলাদা নম্বর দিয়ে দাফনের বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। পরবর্তী সময়ে ডিএনএ বা অন্য কোনো প্রমাণের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হলে যাতে মরদেহের অবস্থান খুঁজে পাওয়া যায়, সে ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।

নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ ভাটির এলাকাগুলোতে, বিশেষ করে চিতওয়ানে যাচ্ছেন। কেউ কেউ হাতে নিখোঁজ স্বজনের ছবি নিয়ে অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণকেন্দ্রের আশপাশে অপেক্ষা করছেন।

এর মধ্যেই নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভূমিধসে নদীর গতিপথ আটকে চীনের তিব্বত অংশে ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে একটি বড় হ্রদ তৈরি হয়েছে। শুক্রবার সেই বাঁধ উপচে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষকেও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় রাসুয়া ও নুয়াকোটকে তাৎক্ষণিকভাবে ১ কোটি নেপালি রুপি করে এবং ধাদিংকে ৫০ লাখ রুপি নগদ সহায়তা দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ৩০টি ট্রাক ও চারটি বিমান কার্গো চালান ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠানো হয়েছে।

মন্ত্রিসভা প্রধানমন্ত্রী ও সব মন্ত্রীর এক মাসের বেতন ও পারিশ্রমিক প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্যাকেজ তৈরির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। ভারত আরও মানবিক সহায়তা পাঠাচ্ছে। তৃতীয় সামরিক উড়োজাহাজে করে আরও ১২ টন ত্রাণসামগ্রী নেপালে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এর আগে দুই দফায় ৪৭ টনের বেশি ত্রাণ পাঠানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রও ৫ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলায় একজন পরামর্শক পাঠানোর কথা জানিয়েছে দেশটি।

বন্যার দুই দিন পরও পুরো পরিস্থিতির চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। একদিকে জীবিতদের সন্ধান ও নিখোঁজদের উদ্ধারে অভিযান চলছে, অন্যদিকে বাড়তে থাকা মরদেহ সংরক্ষণ, শনাক্তকরণ এবং স্বজনদের কাছে হস্তান্তর বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতুর কারণে উদ্ধারকাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থায় নতুন করে পানির প্রবাহ বাড়ে কি না, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে নেপালের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।