নতুন বেতনকাঠামো মন্ত্রিসভায়, দুই অর্থবছরে চার ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব

  • নিজস্ব প্রতিবেদক

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন বেতনকাঠামো আজ মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির চাপ ও সরকারের বাজেট ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে নতুন পে-স্কেল একসঙ্গে কার্যকর না করে দুই অর্থবছরে চার ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনার পর নতুন বেতনকাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিলে প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া শুরু হবে। এ জন্য প্রায় এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন কাঠামোর মূল বেতনের ৩০ শতাংশ চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করা হতে পারে। এরপর আগামী বছরের শুরুতে আরও ৩৫ শতাংশ বাস্তবায়নের সুপারিশ রয়েছে। মূল বেতনের অবশিষ্ট অংশ পরবর্তী অর্থবছরের জুলাই থেকে এবং বিভিন্ন ভাতা একই অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার প্রস্তাব থাকতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রথম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। তবে কমিশনের প্রাথমিক সুপারিশের তুলনায় চূড়ান্ত কাঠামোয় বৃদ্ধির হার কিছুটা কম হতে পারে।

সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টিও নতুন কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় নতুন কোনো পে-স্কেল না হওয়ায় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় বাড়েনি।

একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ২০১৬ সালে একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা যে বেতন ও আর্থিক সুবিধা নিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করেছিলেন, দীর্ঘ সময় পরও সেই কাঠামোর ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। এর ফলে চাকরির শুরুতেই অনেককে আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে। একই সময়ে বেসরকারি ব্যাংকসহ বিভিন্ন খাতে বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসহ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে দেশের অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া চাপও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এ কারণে কর্মচারীদের প্রত্যাশা পূরণ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ওপর চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ধাপে ধাপে নতুন কাঠামো কার্যকরের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান ছিলেন কমিশনের চেয়ারম্যান।

নবম বেতন কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়ে সুপারিশ দিতে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থসচিব, জনপ্রশাসনসচিব, আইনসচিব, প্রতিরক্ষাসচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব, স্বাস্থ্যসেবাসচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রককে রাখা হয়।

বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। নবম বেতন কমিশনের প্রস্তাব পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।

তবে নাসিমুল গনি কমিটি বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশের বেশি না রাখার সুপারিশ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কমিটির প্রস্তাবে দুই বছরে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর করার কথা ছিল। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে মূল বেতন এবং পরবর্তী অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ভাতা কার্যকরের পরিকল্পনা ছিল।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুত করা চূড়ান্ত প্রস্তাবে সেই পরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। মূল বেতন ১ জুলাই থেকেই কার্যকর করার নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও পুরো বর্ধিত বেতন একবারে না দিয়ে কয়েক ধাপে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর আগে গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে। বাজেট বক্তৃতায় তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই বেতনকাঠামোয় বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই নতুন বেতনকাঠামো কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এখন মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরই নতুন বেতনকাঠামোর বাস্তবায়ন পদ্ধতি, বেতন বৃদ্ধির হার এবং কোন ধাপে কত শতাংশ কার্যকর হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে।