দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এবার কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় সিন্ডিকেটের প্রভাব কমিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে কোনো অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই মালয়েশিয়ায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এসব তথ্য জানিয়েছে।
মন্ত্রণালয় বলেছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং রাজা সুলতান ইব্রাহিম ইস্কান্দারের সঙ্গে আলোচনা করেন। সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘ আলোচনার পর বাজারটি পুনরায় চালুর বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে।
সরকারের বিশেষ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে ‘জিরো কস্ট’ ব্যবস্থায় নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে। অর্থাৎ এসব কর্মীর বিমান ভাড়াসহ অভিবাসনসংক্রান্ত ব্যয় নিয়োগকর্তাই বহন করবেন।
সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)-এর মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে কর্মীদের মালয়েশিয়ায় পাঠানোর মধ্য দিয়ে নতুন ব্যবস্থার কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এবার কর্মী নিয়োগে আগের তুলনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মালয়েশিয়া সরকার প্রথমে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে মনোনয়ন দিয়েছিল। তবে বাংলাদেশ সরকারের আপত্তি ও দীর্ঘ ছয় মাসের আলোচনার পর প্রক্রিয়াটি আরও উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নতুন ব্যবস্থায় মনোনীত ২৫টি এজেন্সির পাশাপাশি আরও ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে অ্যাসোসিয়েট এজেন্সি হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে বোয়েসেলও থাকছে। ফলে মোট ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠান কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে।
মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব এজেন্সির স্বচ্ছতা ও সক্ষমতা যাচাই করেছে মালয়েশিয়া-বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটি। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত সিন্ডিকেটভিত্তিক ব্যবস্থার পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে।
কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। শ্রমবাজার দ্রুত চালুর স্বার্থে বিতর্কিত ও সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত মেডিকেল সেন্টারগুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে অনুমোদিত ১৬টি মেডিকেল সেন্টারের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষার কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে মেডিকেল সেন্টারের তালিকা এখানেই চূড়ান্ত নয়। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ তালিকা নির্ধারণ করতে মালয়েশিয়ার একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল শিগগির বাংলাদেশ সফর করবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের হয়রানি বন্ধ এবং নিরাপদে কর্মস্থলে পৌঁছানো নিশ্চিত করতেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধের পাশাপাশি কর্মীদের সরাসরি নির্ধারিত কর্মস্থলে যোগদানের বিষয়টি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কর্মীদের অভিযোগ দ্রুত সমাধানের জন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং সেল ও হেল্পডেস্ক চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
এদিকে শ্রমবাজার চালুর খবরকে কেন্দ্র করে দালাল ও প্রতারকচক্র যাতে সক্রিয় হতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক করেছে মন্ত্রণালয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর চূড়ান্ত প্রক্রিয়া এখনও চলমান রয়েছে।
সরকারি নির্দেশনা বা আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে টাকা না দেওয়ার জন্য সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ সময় পাসপোর্ট জমা দেওয়া কিংবা কথিত নিয়োগের জন্য মেডিকেল পরীক্ষা না করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের আশা, নতুন ব্যবস্থায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি প্রতারণা ও অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় কমবে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
