বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মারা গেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন।
বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন তার মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত করেছেন। এ সময় হাসপাতালে বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান, নাতনি জাইমা রহমান, ছোট ছেলের বউ শার্মিলী রহমান সিঁথি, ছোট ভাই শামীম এসকান্দার, ছোট ভাইয়ের স্ত্রী, বড় বোন সেলিনা ইসলামসহ সকল আত্মীয়স্বজন এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের সকল চিকিৎসকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজার সময়সূচি পরবর্তীতে জানিয়ে দেওয়া হবে বলে বিএনপির প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সাল থেকে তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকার প্রধানও ছিলেন। ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় তার জন্ম। তার আদি বাড়ি ফেনী জেলায়। তিনি ১৯৬০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন।
১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর, তিনি ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারী বিএনপিতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর, খালেদা জিয়া এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং ‘আপোষহীন নেত্রী’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তাকে সাতবার আটক করা হয়েছিল।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে তিনি প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। তার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে পরিণত হয় এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। তিনি জাতিসংঘে গঙ্গার পানিবণ্টন ইস্যু উত্থাপন করেন এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভূমিকা রাখেন।
১৯৯৬ সালে সংক্ষিপ্ত মেয়াদের জন্য এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় তাকে ২৯ নম্বরে স্থান দেয়।
২০০৭ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২০ সালে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেলেও তিনি কার্যত গৃহবন্দি ছিলেন। ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট তিনি পুরোপুরি মুক্তি পান।
তিনি একটি অনন্য নির্বাচনী রেকর্ডের অধিকারী; ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি মোট ২৩টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতেই জয়লাভ করেন এবং কোনো আসনে কখনও পরাজিত হননি।
দীর্ঘদিন ধরে লিভার, কিডনি, হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। গত ২৩ নভেম্বর থেকে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনীতির একটি যুগের সমাপ্তি ঘটল।
