ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা দাখিল ও যাচাই প্রক্রিয়া

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক প্রার্থীদের দাখিল করা হলফনামার বিভিন্ন তথ্য প্রচারের জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) নির্দেশনা জারি করেছে। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় এসব তথ্য অসত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থী ঝড়ে পড়বেন বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দিলে তার বিরুদ্ধে ‘কাউন্টার এফিডেভিট’ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী, যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য প্রার্থীকে জন্মতারিখ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আয়ের উৎস, মামলার তথ্যসহ একগুচ্ছ বিষয়ে হলফনামা দাখিল করতে হবে। এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন আইনে সংস্কার এনে অসত্য তথ্য দেওয়ার ঘটনায় ভোটের পরও ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান যুক্ত করেছে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ৩০০ আসনে প্রায় আড়াই হাজার মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক রাজনৈতিক দলের দুই হাজারের বেশি প্রার্থী রয়েছেন, বাকিরা স্বতন্ত্র। মনোনয়নপত্র বাছাই চলবে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত। বাছাই, আপিল ও নিষ্পত্তি শেষে প্রার্থিতা চূড়ান্ত হবে ২০ জানুয়ারি। ২১ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তারা প্রার্থীদের প্রতীক বণ্টন করবেন। সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ১২ ফেব্রুয়ারি, যেদিন গণভোটও রয়েছে।

নির্বাচন কমিশন প্রার্থীদের হলফনামা দাখিল, তথ্য বাছাই, প্রচার এবং বাছাইকালে সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধির উপস্থিতির বিষয়ে সব রিটার্নিং কর্মকর্তার জন্য পরিপত্র জারি করেছে। মনোনয়নপত্র জমার শেষ সময়ে নির্বাচন পরিচালনা শাখার উপ-সচিব মনির হোসেন এ সংক্রান্ত পরিপত্র প্রেরণ করেন।

হলফনামায় প্রয়োজনীয় তথ্য:

· জন্ম তারিখ এবং মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় প্রার্থীর বয়স।
· সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদসহ উত্তীর্ণ পরীক্ষার নাম। নিরক্ষর বা স্বাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন হলে সেই তথ্য উল্লেখ করতে হবে। সর্বশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ না থাকলে নম্বরপত্র দাখিল করা যাবে।
· প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা আছে কিনা; রায় হলে তা উল্লেখ করতে হবে।
· পেশার বিবরণী।
· নির্ভরশীলদের পেশার বিস্তারিত তালিকা।
· দেশে ও বিদেশে প্রার্থী এবং নির্ভরশীলদের আয়ের উৎস। আয়কর রিটার্ন এবং মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেওয়া তথ্য সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
· দেশে ও বিদেশে প্রার্থীর নিজের বা নির্ভরশীলদের সম্পদ ও দায়ের বিবরণী।
· আগে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হলে, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং অর্জনের পরিমাণের বিবরণী।
· ঋণ সংক্রান্ত তথ্যাবলী: কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে একক বা যৌথভাবে বা নির্ভরশীলদের ঋণের পরিমাণ। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, ম্যানেজিং ডিরেক্টর বা ডিরেক্টর হলে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণের তথ্য।
· সর্বশেষ আয়কর রিটার্ন জমার বিবরণ।

মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিলের কাগজপত্র:

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা বা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে সরাসরি মনোনয়নপত্র দাখিল করতে হবে। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামার নমুনা অনুযায়ী হলফনামা, নির্বাচনি ব্যয় নির্বাহের জন্য অর্থ প্রাপ্তির সম্ভাব্য উৎসের বিবরণী, সম্পদ ও দায় এবং বার্ষিক আয় ও ব্যয় বিবরণী দাখিল করতে হবে। দাখিল করা হলফনামার তথ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে।

যদি কোনো প্রার্থী হলফনামা দাখিল না করেন, বা দাখিল করা হলফনামায় অসত্য তথ্য দেন, তথ্য গোপন করেন অথবা তথ্যের সমর্থনে যথাযথ প্রমাণ দাখিল না করেন, তাহলে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা যাবে।

হলফনামা ও অন্যান্য তথ্য মনোনয়নপত্র জমার দিন থেকে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, হলফনামার মূল কপি ছাড়াও ফটোকপি করে আরও দুটি অনুলিপি প্রকাশের ব্যবস্থা নিতে। মূল কপি রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে সংরক্ষণ করতে হবে, এক কপি কার্যালয়ে প্রদর্শনের জন্য ঝুলিয়ে দিতে হবে এবং আরেক কপি থেকে বিভিন্ন এনজিও, সংবাদমাধ্যম, সুশীল সমাজ বা অন্য কোনো ব্যক্তি ফটোকপি করে নিতে পারবেন।

কাউন্টার এফিডেভিট:

কোনো ব্যক্তি যদি প্রার্থীর প্রদত্ত তথ্য যথার্থ নয় মর্মে শপথনামা প্রদান করেন এবং দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেন, তবে তা কাউন্টার এফিডেভিট হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে। কাউন্টার এফিডেভিট দিতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে উপস্থিত থাকতে হবে। রিটার্নিং অফিসার মনোনয়নপত্র সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে এ ধরনের কাউন্টার এফিডেভিট বিবেচনায় নেবেন। এছাড়া হলফনামার তথ্য সংশোধন বা সংযোজনের জন্য সম্পূরক এফিডেভিটও গ্রহণযোগ্য হবে।

হলফনামার তথ্যাবলী প্রচার:

প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য প্রচারের জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হলফনামার তথ্যাদি লিফলেট আকারে ভোটারদের মধ্যে প্রচার করতে হবে এবং নির্বাচনি এলাকার বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত হাট-বাজার বা জনাকীর্ণ স্থানে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রার্থীদের দেওয়া হলফনামা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হবে।

মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে প্রতিনিধির উপস্থিতি:

মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বা প্রতিনিধি ঋণ খেলাপীদের তথ্য, থানার ওসি ফৌজদারি মামলা সংক্রান্ত তথ্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের স্থানীয় প্রতিনিধি আয়কর রিটার্নের তথ্য এবং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদারকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় তাদের দেওয়া তথ্য গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়ে মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেবেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুসারে, প্রত্যেক মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীর সই করা হলফনামা এবং সর্বশেষ আয়কর রিটার্নের কপি যুক্ত করে দাখিল করার বিধান রয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব প্রার্থীকে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত হলফনামার নমুনা অনুযায়ী বিভিন্ন তথ্য এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে হবে। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামা যথাযথভাবে দাখিল করা হয়েছে কিনা এবং হলফনামার তথ্য সঠিক কিনা, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রিটার্নিং কর্মকর্তার।