স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের সুযোগ বন্ধ করতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচনকে আরও সুশৃঙ্খল ও অংশগ্রহণমূলক করতে আচরণ বিধিমালায় বেশ কিছু সংশোধনী আনারও সুপারিশ করেছে দলটি।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের খসড়া আচরণ বিধিমালার ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত আহ্বান করলে তারই পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতে ইসলামী তাদের সুপারিশ জমা দেয়।
চিঠিতে জামায়াত প্রস্তাব করেছে, সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো রাজনৈতিক দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতাকর্মীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য হিসেবে গণ্য করার বিধান সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের আচরণ বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শিক্ষার্থী-জনতার আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সব ধরনের সাংগঠনিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পরে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করলে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি আওয়ামী লীগ।
এদিকে, বর্তমান সরকার আগামী অক্টোবর মাসে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে। পরবর্তী সময়ে উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের অন্যান্য স্তরের নির্বাচনও পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হওয়ায় আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যেহেতু এসব নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাই আওয়ামী লীগ বা এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র পরিচয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বিষয়টি উত্থাপন করলেও সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো অবস্থান জানানো হয়নি। অন্যদিকে, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বিদ্যমান আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে কমিশন ইতোমধ্যে খসড়া আচরণ বিধিমালা প্রস্তুত করেছে এবং তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত সংগ্রহ করছে। জামায়াতের পাঠানো প্রস্তাবনায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণের বিষয়টি আচরণ বিধিতে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা, স্থানীয় সরকার প্রশাসনে নিয়োজিত প্রশাসক বা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা এবং নির্বাচনী প্রচারণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন করা।
এছাড়া প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষেত্রে আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করা, নির্বাচনী ক্যাম্পে এলইডি ডিসপ্লে, প্রজেক্টর ও ল্যাপটপ ব্যবহারের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা যুক্ত করা এবং ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের প্রবেশ ও সংবাদ সংগ্রহের অধিকার বিষয়ে স্পষ্ট বিধান অন্তর্ভুক্ত করারও প্রস্তাব দিয়েছে দলটি।
জামায়াত আরও প্রস্তাব করেছে, ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত নারী সদস্যপদের বর্তমান ব্যবস্থা বাতিল করে প্রতিটি ওয়ার্ডে নারীদের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করার ব্যবস্থা চালু করা হোক। পাশাপাশি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচনে ভোটার কারা হবেন, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের প্রশ্নটি আগামী দিনগুলোতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। এখন নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাব পর্যালোচনা করে আচরণ বিধিমালার চূড়ান্ত খসড়ায় কী অন্তর্ভুক্ত করে, সেদিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের।
