ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত চতুর্থ গণভোটে জুলাই সনদের সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮ দফা বাস্তবায়নে ব্যাপক সম্মতি দিয়েছেন দেশের নাগরিকরা। নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ শুক্রবার নির্বাচন ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান।
গণভোটে মোট ৭ কোটি ৬ লাখ ৪০ হাজার ৫৬ জন ভোটার অংশ নেন, যা মোট ভোটারের ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন। শতকরা হিসেবে যা ৬৮ দশমিক ০৬ শতাংশ। অন্যদিকে সংস্কার বাস্তবায়নে অসম্মতি জানিয়ে ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন, অর্থাৎ ৩১ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ চলে। ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২৯৭টির ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। চট্টগ্রামের দুটি আসনের ফলাফল আদালতের নির্দেশনা অনুসারে পরে দেওয়া হবে।
গণভোটের প্রশ্ন ও প্রস্তাবনা
জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য একটি ব্যালটের বাইরে গণভোটের জন্য একটি অতিরিক্ত ব্যালট পেপার দেওয়া হয় ভোটারদের। সেখানে একটি যৌগিক প্রশ্নের মাধ্যমে চারটি বিষয়ে মতামত নেওয়া হয়:
“আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?”
ক) নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
খ) আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
গ) সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার-সহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
ঘ) জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র যৌগিক প্রশ্নের উত্তর হিসেবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে নিজেদের মতামত জানিয়েছেন ভোটাররা।
জুলাই সনদে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের মোট ৮৪টি দফা রয়েছে। এর মধ্যে সংবিধান সংক্রান্ত ৪৮ দফা ছাড়া বাকিগুলোকে ‘আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কার’ হিসাবে চিহ্নিত করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেই এটাই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম গণভোট।
সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৫৯%
একই দিনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল প্রসঙ্গে ইসি সচিব জানান, ২৯৭টি আসনের ফল ঘোষণা করা হয়েছে। এসব আসনে গড় ভোট পড়েছে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আগেই জানানো হয়েছে, ২৯৯ আসনের মধ্যে বিএনপি পেয়েছে ১৫১টি, জামায়াতে ইসলামী ৪২টি, এনসিপি তিনটি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি, খেলাফত মজলিস একটি, বিজেপি একটি ও গণসংহতি আন্দোলন একটি আসন পেয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন চারটি আসনে।
ফিরে দেখা: আগের তিনটি গণভোট
বাংলাদেশে এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো গণভোট অনুষ্ঠিত হলো। এর আগে তিনটি গণভোটের ফলাফল ছিল নিম্নরূপ:
নির্বাচন প্রশ্ন ফলাফল
১৯৭৭ সালের ৩০ মে, প্রথম গণভোট রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তার অনুসৃত নীতি ও কর্মপন্থার প্রতি আস্থা আছে কি না? ৯৮ দশমিক ৮ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট এবং ১ দশমিক ১২ শতাংশ ‘না’ ভোট
১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ, দ্বিতীয় গণভোট রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অনুসৃত নীতি ও কর্মপন্থার প্রতি আস্থা এবং স্থগিত সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠান পর্যন্ত তার রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত থাকার বিষয়ে সম্মতি আছে কি না? ৯৪ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট এবং ৬ শতাংশের মতো ‘না’ ভোট
১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর, তৃতীয় গণভোট গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান (দ্বাদশ সংশোধন) বিল, ১৯৯১-এ রাষ্ট্রপতির সম্মতি দেওয়া উচিত কি না? (দেশে কোন ধরনের সরকার পদ্ধতি চলবে) ৮৪ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট এবং ১৬ শতাংশ ‘না’ ভোট
চতুর্থ এই গণভোটের মাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংস্কার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের জনসমর্থন পেলো অন্তর্বর্তী সরকার ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এখন এই ফলাফলের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন ও অন্যান্য সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের পথ তৈরি হলো।
