ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রতিনিধিত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কমেছে

জাতীয় সংসদে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী সদস্যের সংখ্যা এ বার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র সাতজন নারী প্রার্থী জয়লাভ করেছেন, যা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে সবচেয়ে কম।

গত ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ২২ জন নারী সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হওয়ার রেকর্ড গড়েছিলেন। এরপর ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১৯-এ। সর্বশেষ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তা আরও কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র সাতে।

গণআন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দ্বাদশ সংসদ ভেঙে দেওয়ার প্রায় দেড় বছর পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র ৮১ জন। মোট প্রার্থীর তুলনায় নারী প্রার্থীর হার মাত্র ৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ।

বিগত নির্বাচনগুলোর দিকে তাকালে নারী প্রতিনিধিত্বের এই চিত্র আরও স্পষ্ট হয়—

· ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ: ৬৮ নারী প্রার্থীর মধ্যে জয়ী ২২ জন
· ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ: ৯৬ নারী প্রার্থীর মধ্যে জয়ী ১৯ জন
· ২০১৪ সালের দশম সংসদ: ২৯ নারী প্রার্থীর মধ্যে জয়ী ১৮ জন
· ২০০৮ সালের নবম সংসদ: ৫৯ নারী প্রার্থীর মধ্যে জয়ী ১৯ জন
· ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ: ৩৮ নারী প্রার্থীর মধ্যে জয়ী ৬ জন
· ১৯৯৬ সালের জুনের সপ্তম সংসদ: ৩৮ নারী প্রার্থীর মধ্যে জয়ী ৬ জন
· ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ সংসদ: ৩৬ নারী প্রার্থীর মধ্যে জয়ী ৮ জন
· ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ: ৩৯ নারী প্রার্থীর মধ্যে জয়ী ৫ জন

এবারের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২০৯টিতে জয় পেয়েছে বিএনপি, আর দলটি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে প্রায় দুই দশক পর। নির্বাচনে বিজয়ী সাত নারী প্রার্থীর মধ্যে ছয়জনই বিএনপি মনোনীত এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেছেন। উল্লেখ্য, স্বতন্ত্র এ নারী প্রার্থী আগে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে নির্বাচনে অংশ নেন।

বিজয়ী নারী প্রার্থীরা যাঁরা

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সাত নারী প্রার্থী ও তাঁদের আসন—

· মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আফরোজা খান রিতা (বিএনপি): ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী। সাবেক মন্ত্রী হারুনুর রশীদ খান মুন্নুর মেয়ে তিনি। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ সাঈদ নূর পেয়েছেন ৬৪ হাজার ২৪২ ভোট।

· ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ ইসলাম (বিএনপি): ১ লাখ ২১ হাজার ৬৯৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী খেলাফত মজলিসের মো. আকরাম আলী পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৩০৫ ভোট।

· ফরিদপুর-৩ আসনে চৌধুরী নায়াব ইউসুফ (বিএনপি): ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫৪৫ ভোট পেয়ে জয়ী। জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের যুগ্ম সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক তিনি। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মো. আবদুত তাওয়াব পেয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ১১৫ ভোট।

· ঝালকাঠি-২ আসনে ইসরাত সুলতানা ইলেন ভূট্টো (বিএনপি): ১ লাখ ১৩ হাজার ৪১৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী। ২০০১ সালের নির্বাচনে সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুকে হারিয়ে সংসদ সদস্য হওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। এবার তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর এসএম নেয়ামুল করিম পেয়েছেন ৭০ হাজার ৫৫৬ ভোট।

· সিলেট-২ আসনে তাহসিনা রুশদীর লুনা (বিএনপি): ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৬ ভোট পেয়ে জয়ী। এই আসনে এক সময় সংসদ সদস্য ছিলেন তাঁর স্বামী ও বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী, যিনি নিখোঁজ হন। স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর তিনি রাজনীতিতে আসেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ মুনতাছির আলী পেয়েছেন ৩৮ হাজার ৬৩৫ ভোট।

· ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে রুমিন ফারহানা (স্বতন্ত্র): বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়ে হাঁস প্রতীক নিয়ে লড়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বিএনপি জোট মনোনীত জমিয়তে উলামায়ের প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবিবের চেয়ে ৩৭ হাজার ৫৬৮ ভোট বেশি পান তিনি।

· নাটোর-১ আসনে ফারজানা শারমিন পুতুল (বিএনপি): ১ লাখ ২ হাজার ৭২৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোট মনোনীত জামায়াতে ইসলামীর মো. আবুল কালাম আজাদ পেয়েছেন ৯০ হাজার ৫৬৮ ভোট।