ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ এবং শপ্ঠগ্রহণ নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যে স্পষ্ট তথ্য দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গণঅভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া বাংলাদেশে আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বিএনপি। এক সময়ের মিত্র জামায়াতে ইসলামী এবার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে।
আসন বণ্টন: বিএনপি ২০৯, জামায়াত ৬৮
২৯৯ আসনের মধ্যে ২৯৭টির ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী চট্টগ্রামের দুটি আসনের ফলাফল পরে দেওয়া হবে। এছাড়া জামায়াতের প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে।
ঘোষিত ২৯৭ আসনের ফলাফল নিম্নরূপ:
দলের নাম আসন সংখ্যা
বিএনপি ২০৯
জামায়াতে ইসলামী ৬৮
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১
গণঅধিকার পরিষদ ১
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ১
গণসংহতি আন্দোলন ১
খেলাফত মজলিস ১
স্বতন্ত্র ৭
ইতিহাসের পাতায় বিএনপি-জামায়াত
এবারের নির্বাচনে বিএনপির ২০৯ ও জামায়াতের ৬৮ আসন প্রাপ্তি বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিগত নির্বাচনগুলোতে দল দুটির আসন সংখ্যা ছিল নিম্নরূপ:
নির্বাচন বিএনপি জামায়াত
১৯৭৩: প্রথম সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়নি নিষিদ্ধ
১৯৭৯: দ্বিতীয় সংসদ ২০৭ –
১৯৮৬: তৃতীয় সংসদ বর্জন ১০
১৯৮৮: চতুর্থ সংসদ বর্জন বর্জন
১৯৯১: পঞ্চম সংসদ ১৪০ ১৮
১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি): ষষ্ঠ সংসদ ২৭৮ বর্জন
১৯৯৬ (জুন): সপ্তম সংসদ ১১৬ ৩
২০০১: অষ্টম সংসদ ১৯৩ ১৭
২০০৮: নবম সংসদ ৩০ ২
২০১৪: দশম সংসদ বর্জন নিবন্ধন বাতিল
২০১৮: একাদশ সংসদ ৬ নিবন্ধন বাতিল
২০২৪: দ্বাদশ সংসদ বর্জন নিবন্ধন বাতিল
২০২৬: ত্রয়োদশ সংসদ ২০৯ ৬৮
ভোটের হার ও গণভোট
শুক্রবার নির্বাচন ভবনে সংবাদ সম্মেলনে ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, সংসদ নির্বাচনে ২৯৭ আসনে গড় ভোট পড়েছে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আর একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটে ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২৯৯ আসনের গণভোটের তথ্য একীভূত করে এই হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
গণভোটে জুলাই সনদের সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮ দফা বাস্তবায়নে ৬৮ দশমিক ০৬ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন।
ফলাফলের গেজেট প্রকাশ কবে?
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, যত দ্রুত সম্ভব ২৯৭ আসনে বিজয়ীদের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একসঙ্গে সবার নাম, ঠিকানাসহ গেজেট প্রকাশ করা হবে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, শুক্রবারের মধ্যেই ২৯৭ জনের গেজেট প্রকাশ করা হতে পারে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গেজেটটি সরকারের কাছে পাঠাবে ইসি সচিবালয়।
শপ্ঠগ্রহণ কে পড়াবেন?
নতুন সংসদ সদস্যদের শপ্ঠগ্রহণ নিয়ে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে। দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী মামলার আসামি হয়ে বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুও মামলার আসামি হয়ে কারাগারে আছেন। ফলে নতুন সংসদ সদস্যদের কে শপথ পড়াবেন, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী, তিন দিন পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার নবনির্বাচিতদের শপথ পাঠ করাতে পারেন।
নির্বাচন কমিশনার মাছউদ এ প্রসঙ্গে বলেন, “১৪৮ এর ৩ ধারায় বলা হয়েছে, স্পিকার অথবা ডেপুটি স্পিকার যদি না পড়ান, বা তারা পড়াতে অসমর্থ হন বা না থাকেন, তাহলে তিন দিন পরেও চতুর্থ দিন থেকে পরবর্তী দিন প্রধান নির্বাচন কমিশনারই শপথ পাঠ করাবেন।”
তিনি আরও জানান, সামনে রোজা থাকায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ইসির কাজ গেজেট প্রকাশ করা। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে সরকার। দ্রুত শপথ করে রমজানের আগেই চাইলে নতুন সরকার গঠন করতে পারে।
এর আগে ৫ ফেব্রুয়ারি আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছিলেন, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে নতুন সংসদ সদস্যদের ‘রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি’ দ্বারা শপথ পড়ানো যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচিত হওয়ার তিন দিনের মধ্যে কেউ শপথ না পড়ালে সেক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াতে পারবেন।
ফিরে দেখা: আগের ১২টি সংসদ
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এ পর্যন্ত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদের আগ পর্যন্ত নির্বাচনগুলোর সংক্ষিপ্ত চিত্র:
প্রথম সংসদ (১৯৭৩): ৭ মার্চ নির্বাচন। আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টিতে জয়লাভ করে।
দ্বিতীয় সংসদ (১৯৭৯): ১৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন। জিয়াউর রহমানের আমলে বিএনপি ২০৭টি এবং আওয়ামী লীগের দুই অংশ মিলে ৪১টি আসন পায়।
তৃতীয় সংসদ (১৯৮৬): ৭ মে নির্বাচন। বিএনপির বর্জনের মধ্যে এরশাদের জাতীয় পার্টি ১৫৩টি, আওয়ামী লীগ ৭৬টি এবং জামায়াত ১০টি আসন পায়।
চতুর্থ সংসদ (১৯৮৮): ৩ মার্চ নির্বাচন। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ প্রায় সব দলের বর্জনের মধ্যে জাতীয় পার্টি ২৫১টি আসন পায়।
পঞ্চম সংসদ (১৯৯১): ২৭ ফেব্রুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রথম নির্বাচন। বিএনপি ১৪০টি, আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসন পায়।
ষষ্ঠ সংসদ (১৯৯৬ ফেব্রুয়ারি): ১৫ ফেব্রুয়ারি বিতর্কিত নির্বাচন। অধিকাংশ দলের বর্জনের মধ্যে বিএনপি ২৭৮টি আসন পায়। মাত্র চার দিন সংসদ বসার পর বিলুপ্ত হয়।
সপ্তম সংসদ (১৯৯৬ জুন): ১২ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন। আওয়ামী লীগ ১৪৬টি, বিএনপি ১১৬টি আসন পায়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে।
অষ্টম সংসদ (২০০১): ১ অক্টোবর নির্বাচন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট ১৯৩টি আসন পায়, আওয়ামী লীগ পায় ৬২টি।
নবম সংসদ (২০০৮): ২৯ ডিসেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে শেষ নির্বাচন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট ২৬৩টি আসন পায়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট পায় ৩৩টি।
দশম সংসদ (২০১৪): ৫ জানুয়ারি বিএনপির বর্জনের মধ্যে নির্বাচন। আওয়ামী লীগ ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করে।
একাদশ সংসদ (২০১৮): ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন। আওয়ামী লীগ ২৫৭টি, জাতীয় পার্টি ২২টি, বিএনপি ৬টি আসন পায়।
দ্বাদশ সংসদ (২০২৪): ৭ জানুয়ারি নির্বাচন। আওয়ামী লীগ ২২২টি, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৬২টি আসন পায়।
ত্রয়োদশ সংসদের মাধ্যমে বিএনপি দীর্ঘ ১৯ বছর পর ক্ষমতায় ফিরছে। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করতে পারেনি। নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন ও শপ্ঠগ্রহণের তারিখ soonই নির্ধারিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
election-result-130226-02 (1)