মেক্সিকোর সবচেয়ে ভয়ংকর মাদক পাচারকারী সংগঠনগুলোর একটি, হালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেলের (সিজেএনজি) শীর্ষ নেতা ও দেশটির ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ ব্যক্তি নেমিসিও অসিগুয়েরা স্যাভাতেস, যিনি ‘এল মেনচো’ নামে পরিচিত, তিনি সরকারি হেফাজতে মারা গেছেন। তার এই মৃত্যুর পরই গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা মোকাবিলায় হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করার কথা জানিয়েছে মেক্সিকো সরকার।
রোববার পশ্চিম মেক্সিকোর হালিস্কো রাজ্যে বিশেষ বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর হেফাজতে থাকা অবস্থায় তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই তার চক্রের সদস্যরা দেশের অন্তত ২০টি অঙ্গরাজ্যে তাণ্ডব চালায়। তারা রাস্তায় কাঁটা ও পেরেক ছড়িয়ে দিয়ে সড়ক অবরোধ করে, বাস ও অন্যান্য যানবাহন ছিনতাই করে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালায়।
এ পরিস্থিতিতে দেশটির নিরাপত্তামন্ত্রী ওমার গার্সিয়া হারফুচ জানিয়েছেন, সহিংসতা মোকাবিলায় রোববার থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৯ হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিকার্দো ত্রেভিলা আরও জানান, সোমবার পশ্চিম মেক্সিকোতে অতিরিক্ত আড়াই হাজার সেনা পাঠানো হয়েছে।
এই সহিংসতায় এখন পর্যন্ত ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। নিরাপত্তামন্ত্রী জানিয়েছেন, হালিস্কো রাজ্যে মেক্সিকোর ন্যাশনাল গার্ডের অন্তত ২৫ সদস্য নিহত হয়েছেন। এছাড়া, এল মেনচোর মৃত্যু পরবর্তী সহিংসতায় এক কারারক্ষী, রাজ্য কৌঁসুলি দপ্তরের এক সদস্য এবং সিজেএনজির ৩০ সদস্য নিহত হয়েছেন। অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বহু ব্যাংক ও স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ত্রেভিলা এল মেনচোকে গ্রেপ্তারের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেন। তিনি জানান, এল মেনচোর সঙ্গে দেখা করতে আসা তার প্রেমিকার অবস্থান শনাক্ত করে এই মাদক সম্রাটকে ধরা হয়। তাকে গ্রেপ্তারের সময় তার দেহরক্ষীদের সঙ্গে সামরিক কমান্ডোদের তীব্র গোলাগুলি হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং তাপালপা শহর থেকে রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই অভিযানে এল মেনচোর অন্তত ছয় দেহরক্ষী নিহত এবং মেক্সিকান সেনাবাহিনীর তিন সদস্য আহত হয়েছেন। এল মেনচোকে ধরিয়ে দিতে তথ্য দিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর ১৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। মেক্সিকোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ‘তথ্য’ এই গ্রেপ্তারে সহায়ক ছিল, তবে অভিযানে সরাসরি কোনো মার্কিন বাহিনী জড়িত ছিল না। ন্যাশনাল গার্ড ও বিমানবাহিনীর সহায়তায় মেক্সিকান সেনাবাহিনী এই অভিযান পরিচালনা করে।
বিবিসি ভেরিফাইয়ের যাচাই করা সোশাল মিডিয়ার ভিডিওতে হালিস্কো রাজ্যের শহর পুয়ের্তো ভাল্লার্তার একটি হোটেলের সুইমিং পুলে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যটকদের মাথার উপর দিয়ে একটি সামরিক হেলিকপ্টার উড়ে যেতে দেখা গেছে, আর শহরের বিভিন্ন ভবন থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। হালিস্কো রাজ্যের রাজধানী গুয়াদালাহারার উত্তরে সান ইসিদ্রো শহরে চক্রের সদস্যদের সঙ্গে ন্যাশনাল গার্ডের সংঘর্ষের ভিডিওতেও এক সশস্ত্র ব্যক্তিকে কয়েকটি গাড়ির দিকে গুলি ছুঁড়তে দেখা গেছে; অন্য ছবিতে একটি গাড়ির পাশে অন্তত চারটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। একটি রেস্তোরাঁর সিসিটিভি ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয় সময় সকাল ১১টার দিকে ন্যাশনাল গার্ডের একটি ট্রাককে আরেকটি যানবাহন ধাক্কা দেয় এবং ট্রাক লক্ষ্য করে গুলি চালায় চক্রের সদস্যরা।
এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই অনেক শহরে রোববার রাস্তাঘাট জনশূন্য হয়ে পড়ে, কারণ স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের বাড়ির ভিতরে থাকার নির্দেশ দেয়। প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম অবশ্য সোমবার সকালের মধ্যে অবরোধ সরিয়ে সেসব সড়ক খুলে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি এল মেনচোর মৃত্যু ঘটানো সেনা অভিযানের প্রশংসা করে বলেছেন, দেশে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তার অগ্রাধিকার। তিনি আরও বলেন, “দেশে শান্তি আছে, সরকার আছে, সশস্ত্র বাহিনী আছে এবং যথেষ্ট সমন্বয় রয়েছে।”
