নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন আলোচিত সাত খুন মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান। গত ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবনের দীর্ঘ পথচলা
নারায়ণগঞ্জের উকিলপাড়া এলাকায় জন্ম নেওয়া ৫৮ বছর বয়সী সাখাওয়াত হোসেন খানের রাজনীতিতে যাত্রা শুরু হয়েছিল ছাত্রদলের মাধ্যমে। আশির দশকে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ ও ‘হ্যাঁ’–‘না’ ভোটের সময় পোস্টার সাঁটিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। ১৯৮০-৮১ সালে তিনি মুন্সিগঞ্জ জেলা যুবদলের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরে নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজে পড়ার সময় ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখান থেকে নারায়ণগঞ্জ আইন কলেজে এলএলবি সম্পন্ন করে আইন পেশায় যুক্ত হন। আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক, ১৯৯৯ সালে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এবং ২০০২ সালে জেলা বিএনপির সহ–আইনবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান। এ ছাড়া জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও দুই মেয়াদে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনি বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে পরাজিত হন।
আইনজীবী হিসেবে আলোচনায় আসা
২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার পর আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে সাখাওয়াত হোসেন খান সারা দেশে আলোচনায় আসেন। ওই মামলার বিচার ও অভিযুক্ত র্যাব কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের দাবিতে তিনি উচ্চ আদালতে রিট করেন। সেই রিটের ফলেই র্যাবের ওই কর্মকর্তারা গ্রেপ্তার হন। পরবর্তী সময়ে তিনি এই মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে আইনি লড়াই চালিয়ে যান।
এ ছাড়া শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধেও তিনি আইনি সুরক্ষা প্রদানে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
রাজনৈক্তিক নিপীড়নের শিকার
সাখাওয়াত হোসেন খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে আমি ছয় থেকে সাতবার জেল খেটেছি। এমনকি আমার ছেলেকেও তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো ভয়ভীতি বা প্রলোভন আমাকে আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। রাজনৈতিক কারণে আমার বিরুদ্ধে ৭২টি মামলা করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সব কটি মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছি।’
প্রশাসকের দায়িত্বে উন্নয়নের অঙ্গীকার
প্রশাসকের দায়িত্ব পাওয়ার পর নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নে নিজের পরিকল্পনার কথা জানান সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জকে একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত বাণিজ্যিক নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ৫০ থেকে ৬০ দিনের একটি বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে টেকসই ও মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
তিনি আরও জানান, শহরের যানজট, ধুলাবালু ও কিশোর গ্যাং নির্মূলে কাজ করা হবে। শীতলক্ষ্যা নদীর দুই পাড়ের বিভক্তি দূর করে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও বলেন তিনি, যাতে চিকিৎসার জন্য কাউকে ঢাকায় যেতে না হয়।
সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘আমাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী আমি দল-মত–ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য কাজ করব। নারায়ণগঞ্জকে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত করে একটি বাসযোগ্য নগরী উপহার দেওয়াই আমার প্রধান লক্ষ্য।’
নারায়ণগঞ্জের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
সাখাওয়াত হোসেন খানের ভাষায়, নারায়ণগঞ্জ আশাজাগানিয়া শহর। ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পে সমৃদ্ধ এই শহর থেকে দেশের জাতীয় আয়ের একটি বড় অংশ আসে। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে এখানে নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বাসিন্দারা। সড়কনির্ভর এই শহরে যানজট একটি বড় সমস্যা।
তিনি বলেন, ‘শহরের রাস্তাঘাটসহ অন্যান্য সেবা পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়নি। সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।’
চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটি শিল্প ও বাণিজ্য নগরী হওয়ায় এখানে আর্থিক সন্ত্রাসী কার্যক্রম, কিশোর গ্যাং, মাদক, ফুটপাত দখল ও যানজটের সমস্যা রয়েছে। এই সমস্যাগুলো নিরসনে আগামী ৫০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হবে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে নারায়ণগঞ্জে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আমি আশা করছি।’
ব্যক্তিজীবন
সাখাওয়াত হোসেন খান মুন্সিগঞ্জ এলাকার ব্যবসায়ী ফজল খান ও হোসনে আরা খানম দম্পতির তিন ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সবার বড়। তাঁর স্ত্রী শামীমা আক্তার একজন আইনজীবী এবং ছেলে শাহরিয়ার খান লন্ডনে পড়াশোনা করছেন।
