দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) এক নাটকীয় ও উত্তেজনাকর দিন শেষে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পোশাক শিল্পের ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর হিসেবে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেয় সরকার। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন ব্যবসায়ী এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হলেন।
অন্যদিকে, বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের শেষ দিনটি ছিল অত্যন্ত বিক্ষোভময়। আগের দিন তিন কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক বদলির জের ধরে সকাল থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক চত্বরে কর্মকর্তাদের প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকারীরা গভর্নরের পদত্যাগ দাবি করেন এবং দাবি না মানলে কলম বিরতির হুঁশিয়ারি দেন।
দিনের শুরু যেভাবে
আগের দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ তিন কর্মকর্তাকে শৃঙ্খলাজনিত কারণে ঢাকার বাইরে বদলি করলে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। বদলির তালিকায় বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল, ঢাকার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক থাকায় সংগঠনটি বিক্ষোভের ডাক দেয়।
বেলা ১১টার দিকে ৩০ তলা ভবনের সামনে ব্যানার টাঙানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রতিবাদ। দুপুরের দিকে কর্মকর্তাদের ভিড় বাড়তে থাকে এবং তারা বদলি প্রত্যাহার ও গভর্নরের পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার হন।
গভর্নরের সংবাদ সম্মেলন
উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে দুপুর ১টায় হঠাৎ সংবাদ সম্মেলনে আসেন গভর্নর আহসান মনসুর। তিনি অভিযোগ করেন, ব্যাংক একীভূতকরণ ও দুর্বল ব্যাংক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে একটি কুচক্রী মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে।
তিনি বলেন, ”ব্যাংক একীভূতকরণ ও দুর্বল ব্যাংক পুণরুদ্ধার করার চেষ্টার বিরুদ্ধে একটি কুচক্রী মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে কিছু কর্মকর্তা ষড়যন্ত্র করছেন। মার্জার হওয়া ব্যাংক আবার আগের মালিকদের হাতে ফিরিয়ে নিতে একটি মহল উঠেপড়ে লেগেছে।”
বিক্ষোভকারীদের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ”পদত্যাগ কোনো বিষয় নয়। আমি এখানে চাকরি করতে আসিনি, সেবা দিতে এসেছি। প্রয়োজন হলে দুই সেকেন্ড সময় লাগবে না পদত্যাগ করতে। তবে আমরা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেব।”
সংবাদ সম্মেলন শেষে বেলা ২টার দিকে তিনি স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ ব্যাংক ত্যাগ করেন। তখনো নতুন গভর্নরের বিষয়টি গুঞ্জন আকারেই ছিল।
নতুন গভর্নর নিয়োগ
বিকাল ৪টার দিকে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে মো. মোস্তাকুর রহমানকে নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২-এর ১০(৫) ধারা অনুযায়ী তাকে যোগদানের তারিখ থেকে চার বছরের জন্য এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের আগে তাকে অন্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগ করতে হবে। দায়িত্ব পালনকালে সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তিনি বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পাবেন।
কে এই মোস্তাকুর রহমান?
নবনিযুক্ত গভর্নর মোস্তাকুর রহমান হেরা সোয়েটার্স গার্মেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। ১৯৬৬ সালে ঢাকায় জন্ম নেওয়া এই ব্যবসায়ীর বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাকাউন্টিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরে ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) থেকে এফসিএমএ ডিগ্রি লাভ করেন। প্রায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি করপোরেট ফিন্যান্স, রপ্তানি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছেন।
পেশাগত জীবনে তিনি বিজিএমইএর বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এছাড়া চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের পর্ষদ সদস্য, রিহ্যাব, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিসহ বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন তিনি।
গভর্নর হিসেবে অগ্রাধিকার
নিয়োগের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মোস্তাকুর রহমান বলেন, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সুদের হার কমানো তার প্রধান অগ্রাধিকার হবে।
তিনি বলেন, ”আসলে জানেনই তো অর্থনীতির অবস্থা, ব্যাংকিং খাতের অবস্থা। তাই এই সময়টায় এই দায়িত্ব নিয়ে কাজে তো একটা চ্যালেঞ্জ আছে। ইনশাল্লাহ, আগে ব্যাংকে বসি। সবার সাথে আলোচনা করি। আশা করি সবার সহযোগিতা নিয়ে প্রধান কাজটা হবে- আগে ট্রাস্ট বিল্ডিং ব্যাংকিং খাতে। শৃঙ্খলা আরও ফিরায়ে নিয়ে আসা।”
তিনি আরও বলেন, ”আরেকটা হচ্ছে আমাদের যেটা প্রধান থাকবে যে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য করে আমাদের অর্থনীতিকে যতটুকু রান করা যায়। আপনি জানেন যে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে আসছে, তাই না? তো, এর জন্য চেষ্টা করা- সুদের হারকে কমায়ে নিয়ে আসা। এই কাজগুলো করা।”
বিদায়ী গভর্নরের অর্জন
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার আহসান মনসুরকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়। তার নেতৃত্বে ব্যাংক খাতের সংস্কারের কাজ শুরু হয়। আর্থিক সমস্যায় জর্জরিত পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়।
তার সময়ে বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা তার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ছিল ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দেড় বছরের কিছু বেশি সময়ে রিজার্ভে যুক্ত হয় ১০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার।
যা বললেন অর্থমন্ত্রী
নতুন গভর্নর নিয়োগ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নতুন সরকারের অগ্রাধিকার ও চিন্তা-ভাবনা বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, ”একটা সরকার নতুন সরকার এসেছে। নতুন সরকারের প্রায়োরিটিজ আছে স্বাভাবিকভাবে। পরিবর্তন তো শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকে হয়নি, পরিবর্তন তো অনেক জায়গায় হচ্ছে। এবং এটা তো হতেই থাকবে। নতুন সরকারের যে প্রোগ্রাম আছে, প্রেফারেন্স আছে, চিন্তা আছে, ভাবনা আছে, সবকিছুর সাথে মিলিয়ে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য যেখানে যেখানে প্রয়োজন সেখানে তো পরিবর্তন হবেই।”
দিনভর এই নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। এবার দেখার বিষয়, প্রথম ব্যবসায়ী গভর্নার হিসেবে মোস্তাকুর রহমান ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে কতটুকু সক্ষম হন।
