রফিকুল ইসলাম
বিশ্ববাণিজ্যে প্রতিযোগিতা ও শ্রমমান নিয়ে নতুন বিতর্কের মধ্যে বাংলাদেশসহ একাধিক দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অভিযোগ উঠেছে—কিছু দেশে উৎপাদন সক্ষমতা অত্যধিক হওয়ায় সেসব পণ্য মার্কিন বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে এবং কোথাও কোথাও জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদনের ঝুঁকিও রয়েছে। এসব অভিযোগ যাচাই করতেই মার্কিন প্রশাসন আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) জানিয়েছে, প্রথম ধাপে ১৬টি দেশের উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে তা পরীক্ষা করা হবে। একই সঙ্গে বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে আলাদা আরেকটি তদন্ত চলছে, যেখানে খতিয়ে দেখা হবে—সেসব দেশে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে তৈরি পণ্য রপ্তানি ঠেকাতে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না।
এই তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের সেকশন ৩০১ ধারার অধীনে। এই আইনের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র এমন দেশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে, যাদের নীতি বা কার্যক্রম মার্কিন বাণিজ্যের জন্য বৈষম্যমূলক বা ক্ষতিকর বলে মনে করা হয়।
কোন দেশগুলো তদন্তের আওতায়
অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার অভিযোগে যেসব দেশের নাম এসেছে তাদের মধ্যে রয়েছে চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, ভারত, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, মেক্সিকোসহ বাংলাদেশ। মার্কিন কর্তৃপক্ষের মতে, এসব দেশের উৎপাদন সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় চাহিদার চেয়ে বেশি হওয়ায় অতিরিক্ত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হচ্ছে।
অন্যদিকে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ তদন্তের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশসহ প্রায় ৬০টি দেশ। এই তদন্তে দেখা হবে—সেসব দেশে শ্রম অধিকার রক্ষায় নেওয়া নীতি কতটা কার্যকর এবং জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ঠেকাতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অভিযোগ কী
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্যে প্রায় ৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত রয়েছে। এই উদ্বৃত্তের বড় অংশই এসেছে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে। মার্কিন পক্ষের ধারণা, কিছু ক্ষেত্রে রপ্তানি প্রণোদনা বা উৎপাদন সক্ষমতা বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
এছাড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্যসহ প্রায় ৪৩টি খাতে রপ্তানির জন্য নগদ প্রণোদনা দিয়ে থাকে। পাশাপাশি দেশের সিমেন্ট শিল্পেও উল্লেখযোগ্য উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়ায় এর বড় অংশ অব্যবহৃত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের মতো বাজারভিত্তিক অর্থনীতিতে সরকার সরাসরি উৎপাদনের পরিমাণ নির্ধারণ করে না। তাই অতিরিক্ত উৎপাদনের অভিযোগ কতটা যৌক্তিক—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই তদন্ত মূলত বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য নীতি, শ্রম অধিকার এবং রপ্তানি প্রণোদনা পরীক্ষা করার একটি প্রক্রিয়া। তবে তালিকায় বাংলাদেশের নাম আসা কিছুটা উদ্বেগজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার জানিয়েছেন, অনেক দেশ নিজেদের চাহিদার তুলনায় বেশি পণ্য উৎপাদন করে তা বিদেশি বাজারে পাঠাচ্ছে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য হলো গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খল আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা এবং দেশীয় শিল্পকে শক্তিশালী করা।
তদন্ত প্রক্রিয়া
এই তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে আলোচনা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ইতিমধ্যে তালিকাভুক্ত দেশগুলোর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
১৭ মার্চ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে লিখিত মতামত নেওয়া শুরু হবে এবং ১৫ এপ্রিলের মধ্যে মতামত জমা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। অতিরিক্ত উৎপাদন সংক্রান্ত শুনানি শুরু হবে ৫ মে এবং জোরপূর্বক শ্রম সংক্রান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হবে ২৮ এপ্রিল।
এই তদন্তকে অনেক বিশ্লেষক বৈশ্বিক বাণিজ্য রাজনীতির অংশ হিসেবেই দেখছেন। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে নিজস্ব উৎপাদন খাত পুনরুজ্জীবিত করতে চাইছে এবং বিদেশি প্রতিযোগিতাকে সীমিত করার কৌশল হিসেবে বাণিজ্য তদন্ত বা শুল্ক ব্যবস্থা ব্যবহার করছে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্র দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম বড় বাজার। যদি তদন্তের ফলাফল নেতিবাচক হয়, তাহলে ভবিষ্যতে শুল্ক বৃদ্ধি, বাণিজ্য বিধিনিষেধ বা বাজারে প্রবেশে নতুন শর্ত আরোপের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
