বড় বড় পরিকল্পনা আর আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে জয় পাওয়া ইসলামী ছাত্র শিবির সমর্থিত প্যানেল এখন সমালোচনার মুখে। মেয়াদের অর্ধেক সময় পার হলেও বাস্তব কাজে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে অসন্তোষ। অনেকেই বলছেন, নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ নেওয়ার বদলে কাগজেই আটকে আছে।
গত বছরের ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২৩টি পদের মধ্যে ২০টিতেই জয় পায় শিবির সমর্থিত প্রার্থীরা, যার মধ্যে ভিপি ও এজিএস পদও রয়েছে। নির্বাচনের আগে তারা এক বছরের মধ্যে ২৪ দফা সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছিল। তবে ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ উদ্যোগই এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কিছু ক্ষেত্রে আংশিক অগ্রগতি দেখা গেলেও অনেক উদ্যোগের কাজই শুরু হয়নি।
রাকসু নেতারা দাবি করছেন, এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়াদের শুরুতে বাজেট জটিলতার কারণে প্রথম দেড় থেকে দুই মাস কাজের গতি থমকে ছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়।
অনেক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, প্রশাসনিক জটিলতার অজুহাত তুলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের মতে, ওই সময় জাতীয় নির্বাচন থাকায় রাকসু প্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকায় রাজনৈতিক কার্যক্রমে ব্যস্ত ছিলেন, ফলে ক্যাম্পাসের সমস্যা সমাধানে মনোযোগ ছিল না।
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আবাসন সংকট, হলের খাবারের মান, নিরাপদ পরিবহন ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু এসব মৌলিক সমস্যার সমাধানে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—রাকসুর প্রতিশ্রুতিগুলো কি শুধুই নির্বাচনী কৌশল ছিল?
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী শরীফুল ইসলাম তানবীর বলেন, “নির্বাচনের সময় যেভাবে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। এখন নানা অজুহাত দেখানো হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতারণার শামিল।”
তিনি আরও বলেন, “যদি প্রশাসনের সহযোগিতা না থাকে, তাহলে সেই প্রশাসনের পক্ষ হয়ে অবস্থান নেওয়া কেন? বাস্তবতা হলো, ওই সময়ে তারা ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছিল না।”
ইশতেহারে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন দাবি বাস্তবায়নের কথাও উল্লেখ ছিল। এর মধ্যে রাকসু নির্বাচনকে একাডেমিক ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা, হামলার বিচার, জাদুঘর প্রতিষ্ঠা এবং একটি বিশেষ দিবস ঘোষণার প্রতিশ্রুতি ছিল। তবে এ পর্যন্ত কেবল নির্বাচন ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, অন্যগুলোতে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
খাবারের মান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও বাস্তবে তেমন পরিবর্তন আনতে পারেনি। শিক্ষার্থীরা জানান, মাঝে মাঝে ক্যান্টিন ও ডাইনিং পরিদর্শন করা হলেও তা কার্যকর কোনো পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী এখনো বাইরে খেতে বাধ্য হচ্ছেন।
আবাসন সমস্যা সমাধানে শতভাগ আবাসিকতার রূপরেখা এবং ভর্তুকির পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত হয়নি। এ বিষয়ে রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বড় ধরনের অর্থ ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রয়োজন, যা এখনো পুরোপুরি পাওয়া যায়নি।
তবে শিক্ষার্থীরা এই যুক্তি মেনে নিতে নারাজ। তাদের মতে, নির্বাচনের সময় এসব প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে বাস্তবতার কথা বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল। এখন ‘উচ্চ ব্যয়ের প্রকল্প’ দেখিয়ে পিছিয়ে যাওয়া দায়িত্ব এড়ানোর নামান্তর।
প্রশাসনিক কার্যক্রম সহজ করতে একটি ডিজিটাল অ্যাপ চালুর কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু এখনো সে বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। আগের মতোই জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া চালু রয়েছে বলে অভিযোগ।
এছাড়া মেডিকেল সেন্টার উন্নয়ন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিগুলোও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ধীরে ধীরে হতাশায় রূপ নিচ্ছে।
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সাখাওয়াত নাহিদ বলেন, “নির্বাচনের সময় যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, এখন তা ভেঙে গেছে। নানা খাতে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তেমন কিছুই চোখে পড়ছে না।”
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানোর কথাও ইশতেহারে ছিল। কিন্তু বাস্তবে ভবনগুলোতে লিফট, ব্রেইল সুবিধা বা উপযোগী টয়লেট ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এতে করে শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছেন।
ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের রহমান অমিও বলেন, “লিফট না থাকায় উপরের তলায় ওঠানামা করা খুব কষ্টকর। বিশেষ করে যারা হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন।”
সব মিলিয়ে, রাকসুর বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে ক্যাম্পাসজুড়ে প্রশ্ন ও সমালোচনা বাড়ছে। তবে রাকসু নেতারা বলছেন, তারা এখনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই যতটা সম্ভব অগ্রগতি আনার চেষ্টা করবেন।
