অস্ট্রেলিয়ার এনএসডব্লিউ পার্লামেন্টে ব্যারিস্টার সুমনের বন্দিদশা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

সাবেক সংসদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা, তার দীর্ঘদিনের বন্দিদশা এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস (এনএসডব্লিউ) পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে।

বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সুমনের আইনজীবীরা এ তথ্য জানান। এ সময় তারা তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর সর্বশেষ অবস্থা এবং আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কেও বিস্তারিত তুলে ধরেন।

জামিন আবেদন শুনানির অপেক্ষায়

সুমনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট লিটন আহমেদ বলেন, হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে গত জুলাইয়ের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা মামলায় জেলা ও দায়রা জজ আদালতে জামিন আবেদন করা হলেও তা নামঞ্জুর হয়। পরে হাইকোর্টে জামিন আবেদন করলে আদালত রুল জারি করেন। বর্তমানে বিষয়টি চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

তিনি বলেন, “চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে সাধারণ মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তির বিরুদ্ধে যেভাবে হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে দেশে-বিদেশে বাঙালি কমিউনিটির মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান-বাংলাদেশি কমিউনিটিও তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো স্থানীয় পার্লামেন্টে তুলে ধরেছে।”

তার দাবি, বাংলাদেশে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বেআইনিভাবে আটক রেখে হয়রানির অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা বাড়ছে এবং এ বিষয়ে বিশ্বব্যাপী জনমত গড়ে উঠছে।

‘বিনা বিচারে আটক রাখা শুভকর নয়’

সুমনের আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ খুররাম শাহ মুরাদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিনা বিচারে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আটক রাখা দেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে না।

তিনি বলেন, “ব্যারিস্টার সুমন সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ নেই এবং ৫ আগস্টের সহিংসতার সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা নেই বলে আমরা মনে করি। তারপরও তিনি দীর্ঘদিন কারাগারে রয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

এনএসডব্লিউ পার্লামেন্টে স্টিফেন লরেন্সের বক্তব্য

সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে দেওয়া এক বক্তব্যে লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য স্টিফেন লরেন্স ব্যারিস্টার সুমনের বিষয়টি উত্থাপন করেন।

বাংলাদেশি-অস্ট্রেলিয়ান সম্প্রদায়ের উদ্বেগের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ব্যারিস্টার সুমন বাংলাদেশে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ও দরিদ্র মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন এবং দুর্নীতি, অবিচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন।”

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সুমনের গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “তার স্পষ্টভাষী অবস্থান ও রাজনৈতিক সক্রিয়তার কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি বর্তমানে একাধিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা মামলার মুখোমুখি। এর ফলে তার পরিবারও চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে এবং দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।”

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর উল্লেখ করে স্টিফেন লরেন্স বলেন, “সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রেপ্তার, হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ এবং যথাযথ চিকিৎসার অভাবে বন্দিদের মৃত্যুর বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিবিসি ও আল জাজিরাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এসব বিষয় তুলে ধরেছে। বিষয়টি নথিভুক্ত রাখার স্বার্থেই আমি পার্লামেন্টে এটি উত্থাপন করছি।”

দ্রুত আইনি প্রতিকার প্রত্যাশা

সংবাদ ব্রিফিংয়ে সুমনের আইনজীবীরা বলেন, আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং ব্যারিস্টার সুমনের বিষয়ে যে জনমত গড়ে উঠছে, তার প্রেক্ষাপটে দেশের উচ্চ আদালত তার জামিন ও অন্যান্য আইনি অধিকার বিষয়ে দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত দেবেন বলে তারা আশা করেন।

গ্রেপ্তারের পর থেকে কারাগারে

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর দিবাগত রাতে রাজধানীর মিরপুর-৬ এলাকা থেকে ব্যারিস্টার সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের আগে তিনি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দিয়ে পুলিশের সঙ্গে যাওয়ার বিষয়টি জানান।

এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ঢাকা ও হবিগঞ্জে জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ছাত্র-জনতা হত্যা ও হামলার অভিযোগে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে তার বিরুদ্ধে অন্তত এক ডজন মামলা রয়েছে, যার অধিকাংশই হত্যা ও হত্যাচেষ্টা সংক্রান্ত।