ঢাকা দক্ষিণের ৬৩ ওয়ার্ড ডেঙ্গু ঝুঁকিতে, সর্বোচ্চ শঙ্কায় ২৭ ওয়ার্ড

রাজধানীর দক্ষিণাঞ্চলে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই পরিচালিত এডিস মশার লার্ভা জরিপে দেখা গেছে, ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টি ওয়ার্ড ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে মশার ঘনত্বের ভিত্তিতে ২৭টি ওয়ার্ডকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর নগর ভবনের মিলনায়তনে আয়োজিত ‘বর্ষাপূর্ব এডিস মশার লার্ভা জরিপ ২০২৬’-এর ফলাফল প্রকাশ ও কর্মপরিকল্পনা বিষয়ক অবহিতকরণ সভায় এসব তথ্য তুলে ধরেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম।

সভায় জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করে তিনি জানান, গত ১২ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত ১২ দিনব্যাপী এ জরিপ পরিচালিত হয়। ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটি থেকে ৩০টি করে মোট ২ হাজার ২৫০টি বাড়িকে নমুনা হিসেবে নির্বাচন করা হয়। সম্পূর্ণ দৈবচয়ন ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচালিত এ জরিপে ডিএসসিসি এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার ৩৬ জন মাঠকর্মী অংশ নেন। তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে আধুনিক কোবো টুলবক্স ব্যবহার করা হয়।

মো. আবদুস সালাম বলেন, জরিপ শেষে ব্রেটো ইনডেক্স, হাউজ ইনডেক্স, কনটেইনার ইনডেক্স এবং পিউপা ইনডেক্সের ভিত্তিতে ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব সূচকের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ডেঙ্গু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বা হটস্পট চিহ্নিত করা সহজ হবে।

তিনি বলেন, জরিপের ফলাফলে ডিএসসিসির ৬৩টি ওয়ার্ডে মশার ঘনত্ব নির্ধারিত সূচকের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে, যা ডেঙ্গু সংক্রমণের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। এর মধ্যে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্বের ভিত্তিতে ২৭টি ওয়ার্ডকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জরিপে দেখা গেছে, পরিদর্শন করা ২ হাজার ২৩৮টি বাড়ির মধ্যে ২৮১টিতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে। আক্রান্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে বহুতল ভবনে লার্ভা শনাক্তের হার ছিল ৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। স্বতন্ত্র বাড়িতে এ হার ২৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ, নির্মাণাধীন ভবনে ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং সেমিপাকা বাড়িতে ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

জরিপে আরও উঠে এসেছে যে, এডিস মশার প্রধান প্রজননস্থল হিসেবে বিভিন্ন ধরনের পানি ধারণকারী পাত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে প্লাস্টিকের ড্রাম, মেঝেতে জমে থাকা পানি এবং বালতিতে জমে থাকা পানিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে।

ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণও সমানভাবে প্রয়োজন। তিনি বাসাবাড়ি, কর্মস্থল ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি নিয়মিত জমে থাকা পানি অপসারণের অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, অনেকেই বাথরুম বা অন্যান্য স্থানে বালতিতে কয়েকদিন ধরে পানি জমিয়ে রাখেন। মাত্র দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই এসব স্থানে এডিস মশার লার্ভা জন্ম নিতে পারে। তাই এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে।

আবদুস সালাম আরও বলেন, প্রচলিত ধারণার বিপরীতে এডিস মশা নোংরা বা পচা পানিতে নয়, বরং পরিষ্কার ও স্থির পানিতে বংশবিস্তার করে। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি জানান, জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে আগামী ৬ জুন ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে একটি সচেতনতামূলক র‌্যালির আয়োজন করা হবে। ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর থেকে র‌্যালিটি শুরু হবে এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য এলাকাতেও এ ধরনের কর্মসূচি পরিচালিত হবে।

এ ছাড়া আগামী ৭ জুন থেকে ডেঙ্গু ঝুঁকিতে থাকা ২৭টি ওয়ার্ডে স্বাস্থ্য বিভাগ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সমন্বয়ে পাঁচ দিনব্যাপী বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ পরিচালনা করা হবে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের কাজ করা হবে। এই কার্যক্রম সফল করতে নগরবাসীর সহযোগিতা প্রয়োজন। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমের সহায়তাও কামনা করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার এবং প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নিশাত পারভীন।